ইসলামিক ঘটনা

ইসলামিক ঘটনা

শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।

← সব ঘটনা

হযরত ইসহাক (আ.) এর জন্ম ও সৎকর্মশীল জীবনের ইতিহাস

পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরা—যেমন সূরা হূদ, সূরা আল-হিজর, সূরা আছ-ছাফফাত এবং সূরা আয-যারিয়াত-এ হযরত ইসহাক (আ.)-এর জন্মের সুসংবাদ ও জীবনের বৈশিষ্ট্য বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর স্ত্রী হযরত সারা দীর্ঘদিন নিঃসন্তান ছিলেন। বয়সের ভারে উভয়েই ছিলেন বার্ধক্যে উপনীত। বর্ণিত রয়েছে, ইব্রাহিম (আ.)-এর বয়স তখন প্রায় শতবর্ষ ছুঁইছুঁই এবং সারা (আ.)-ও ছিলেন নব্বইয়ের কোঠায়। পার্থিব নিয়মে তাঁদের সন্তান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। এমতাবস্থায় একদিন মানুষের বেশে একদল রূপবান আগন্তুক ইব্রাহিম (আ.)-এর আবাসে আগমন করেন। তারা ছিলেন মূলত আল্লাহর সম্মানিত ফেরেশতা—হযরত জিবরিল, মিকাইল ও ইসরাফিল (আলাইহিমুস সালাম)। মেহমানবাৎসল্যে অগ্রগণ্য ইব্রাহিম (আ.) কালবিলম্ব না করে তাঁদের সম্মানে একটি ভুনা করা মোটা তাজা বাছুর পরিবেশন করলেন। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করলেন, আগন্তুকদের হাত খাবারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে না। সে যুগে মেহমান খাবার গ্রহণ না করাকে শত্রুতার লক্ষণ মনে করা হতো। ফলে ইব্রাহিম (আ.) মনে মনে কিছুটা শঙ্কিত হয়ে পড়লেন।

ফেরেশতারা তাঁর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন, 'ভয় পাবেন না, আমরা লূতের সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।' এ সময় ইব্রাহিম (আ.)-এর স্ত্রী সারা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি মেহমানদের পরিচয় ও পাপিষ্ঠ কওমের ধ্বংসের কথা শুনে বিস্মিত হলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ফেরেশতাগণ তাঁকে এক পরম সুসংবাদ দিলেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: 'অতঃপর আমি তাকে সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের এবং ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকুবের।' (সূরা হূদ: ৭১)।

এই অপ্রত্যাশিত সুসংবাদ শুনে হযরত সারা বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলেন এবং লজ্জায় মুখ চেপে ধরে বললেন, 'হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি কি সন্তান প্রসব করব যখন আমি এক বৃদ্ধা নারী এবং আমার স্বামীও অতি বৃদ্ধ? এটা তো এক বিস্ময়কর ব্যাপার!' (সূরা হূদ: ৭২)। তখন সম্মানিত ফেরেশতাগণ তাঁকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, 'আপনি কি আল্লাহর হুকুম বা কুদরতে বিস্ময় প্রকাশ করছেন? হে আহলে বাইত! আপনাদের ওপর রয়েছে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকত।' ফেরেশতাগণ ইব্রাহিম (আ.)-কেও অভয় দিয়ে বললেন, 'আমরা আপনাকে এক বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি।' (সূরা আল-হিজর: ৫৩)।

আল্লাহর নির্ধারিত সময়ে হযরত সারার গর্ভে জন্ম নিলেন হযরত ইসহাক (আলাইহিস সালাম)। তাঁর জন্ম ছিল আল্লাহর এক জীবন্ত মুজিজা। পিতা ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন এবং দোয়া করলেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে বার্ধক্যে ইসমাইল ও ইসহাককে দান করেছেন; নিশ্চয় আমার প্রতিপালক প্রার্থনা শ্রবণকারী।' (সূরা ইব্রাহিম: ৩৯)।

ইসহাক (আ.) পিতার কোলে তাওহীদ, তাকওয়া ও চারিত্রিক পবিত্রতার আবহে বেড়ে ওঠেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নবুওয়াতের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। তিনি শাম ও কেনান অঞ্চলের মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত, ইনসাফ ও সৎকাজের নির্দেশ দিতেন। পবিত্র কুরআনে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে: 'এবং আমি তাদেরকে করেছিলাম নেতা, যারা আমার নির্দেশে পথ প্রদর্শন করত; আর আমি তাদেরকে ওহী যোগে সৎকাজ করার, নামাজ কায়েম করার ও জাকাত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলাম; এবং তারা ছিল আমারই খাঁটি ইবাদতকারী।' (সূরা আল-আম্বিয়া: ৭৩)।

ইসহাক (আ.) সারাজীবন পরম নিষ্ঠা ও তাকওয়ার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদিসে তাঁকে 'আল-কারীম ইবনুল কারীম ইবনিল কারীম ইবনিল কারীম' (মর্যাদাবানের পুত্র মর্যাদাবান, তাঁর পুত্র মর্যাদাবান, তাঁর পুত্র মর্যাদাবান) বলে ভূষিত করেছেন—যাঁরা হলেন ইসহাক ইবনে ইব্রাহিম, তাঁর পুত্র ইয়াকুব এবং তাঁর পৌত্র ইউসুফ (আলাইহিমুস সালাম)। ইসহাক (আ.) দীর্ঘ বরকতময় জীবন অতিবাহিত করে ফিলিস্তিনের মাটিতেই ওফাত বরণ করেন এবং পিতার স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র স্থানে সমাহিত হন।

======================================================================

বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ (KEY PRACTICAL LESSONS)

======================================================================

(1) [আল্লাহর অপার কুদরত ও তাওয়াক্কুল] আল্লাহর রহমত থেকে কখনোই নিরাশ হওয়া জায়েজ নয়।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: চরম বার্ধক্য ও আপাত বন্ধ্যাত্ব সত্ত্বেও আল্লাহ সারা ও ইব্রাহিম (আ.)-কে সন্তান দান করেছেন। বাহ্যিক উপায়-উপকরণ ফুরিয়ে গেলেও মুমিনের উচিত কেবল আল্লাহর কুদরত ও দয়ার ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা।

(2) [মেহমানদারীর ইসলামি শিষ্টাচার] মেহমানকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন ও দ্রুত আপ্যায়ন করা নবীদের সুন্নত।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: ইব্রাহিম (আ.) অপরিচিত মেহমানদের দেখেই কালবিলম্ব না করে উৎকৃষ্ট খাবার ভুনা বাছুর দিয়ে আপ্যায়ন করেছিলেন। এটি একজন প্রকৃত মুমিনের অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

(3) [নেতৃত্ব ও সৎকর্মশীলতা] প্রকৃত ধর্মীয় নেতৃত্ব অর্জিত হয় সৎকাজ ও প্রার্থনার ধারাবাহিকতায়।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: কুরআনে ইসহাক (আ.)-কে এমন নেতা বলা হয়েছে যিনি নামাজ, জাকাত ও ওহীর নির্দেশনার মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথ দেখাতেন। দ্বীনি নেতৃত্বে আমল ও তাকওয়া অপরিহার্য।

(4) [পারিবারিক আভিজাত্য ও নৈতিক পরম্পরা] পবিত্র বংশধারা ও পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার গভীর প্রভাব রয়েছে।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইসহাক (আ.)-এর পরিবারকে চার প্রজন্মের নবীদের ধারাবাহিক মর্যাদাপূর্ণ পরিবার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পরিবারে দ্বীনের চর্চা থাকলে তা প্রজন্মান্তরে কল্যাণ বয়ে আনে।

← সব ঘটনা

Scroll to Top