ইসলামিক ঘটনা
শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।
হযরত লূত (আ.) এর দাওয়াত ও সাদূমবাসীদের ওপর পাথরের বৃষ্টি
হযরত লূত (আ.) হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সাথে ইরাকের বাবেল থেকে হিজরত করে শাম (সিরিয়া-ফিলিস্তিন) অঞ্চলে আসেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা লূত (আ.)-কে নবুওয়াত দান করে সাদূম এবং তার পার্শ্ববর্তী জনপদের অধিবাসীদের হিদায়েতের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, লূত (আ.) তাঁর জাতিকে সম্বোধন করে বলেছিলেন: 'তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সমগ্র জাহানের কেউ করেনি? তোমরা কি নারীদের ছেড়ে পুরুষদের নিকট কামতৃপ্তির উদ্দেশ্যে যাচ্ছ? বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী এক সম্প্রদায়' (সূরা আল-আ'রাফ: ৮০-৮১)। তিনি তাদেরকে আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখান এবং নিষ্কলুষ পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানান। কিন্তু সাদূমবাসীদের উদ্ধত জবাব ছিল চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ। তারা বলল: 'লূতের পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও; এরা তো এমন লোক যারা অতি পবিত্র হতে চায়!' (সূরা আন-নামল: ৫৬)। তারা নবীর সতর্কবার্তাকে উপহাস করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল, পারলে আল্লাহর আযাব নিয়ে এসো।
অবশেষে যখন সাদূমবাসীদের তওবার সমস্ত সুযোগ নিঃশেষ হয়ে গেল এবং তাদের পাপের বোঝা পূর্ণ হলো, তখন মহান আল্লাহ তাদের সমূলে ধ্বংস করার চূড়ান্ত ফয়সালা অবতীর্ণ করলেন। আল্লাহ তাআলা প্রধান ফেরেশতা হযরত জিব্রাঈল, মিকাঈল ও ইসরাফীল (আ.)-কে মানবাকৃতিতে সুদর্শন যুবকদের বেশে প্রেরণ করলেন। প্রথমে এই ফেরেশতাগণ হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর নিকট ইসহাক (আ.)-এর সুসংবাদ নিয়ে উপস্থিত হন এবং জানান যে তাঁরা লূত (আ.)-এর কওমকে ধ্বংস করতে যাচ্ছেন। ইব্রাহীম (আ.) শঙ্কিত হয়ে বিনম্র আরজি পেশ করেন যে, সেখানে তো লূত (আ.) রয়েছেন! ফেরেশতাগণ আশ্বস্ত করেন যে, লূত ও তাঁর মুমিন পরিবারকে রক্ষা করার দায়িত্ব আল্লাহর।
এরপর ফেরেশতাগণ সন্ধ্যায় সাদূম নগরীতে হযরত লূত (আ.)-এর গৃহে মেহমান হিসেবে পদার্পণ করেন। অপূর্ব সুন্দর যুবকদের দেখে লূত (আ.) চরম উদ্বিগ্ন ও বিচলিত হয়ে পড়লেন; কারণ তিনি জানতেন তাঁর কওমের অবাধ্যতা ও বিকৃত লালসার কথা। তিনি মনে মনে বললেন, 'আজকের দিনটি অত্যন্ত সংকটময় ও কঠিন' (সূরা হূদ: ৭৭)। লূত (আ.) মেহমানদের পরিচয় গোপন রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর অবিশ্বাসী স্ত্রী গোপনে নগরীর পথভ্রষ্ট লোকদের কাছে খবর পৌঁছে দেয় যে, লূতের ঘরে পরমা সুন্দরী মেহমান এসেছে। মুহূর্তের মধ্যে কামোন্মত্ত সাদূমবাসীরা লূত (আ.)-এর গৃহ ঘেরাও করে ফেলে এবং মেহমানদের তাদের হাতে সোপর্দ করার দাবি জানায়। লূত (আ.) ভেতর থেকে অত্যন্ত ব্যথিত ও কাতর হয়ে বললেন, 'হে আমার কওম! এরা আমার মেহমান, সুতরাং আমাকে লাঞ্ছিত করো না। আল্লাহকে ভয় করো; তোমাদের মধ্যে কি একজনও ভালো মানুষ নেই?' (সূরা হূদ: ৭৮)। তিনি তাদের বৈধ বিবাহের দিকে আহ্বান জানালেও তারা বলল, 'তুমি তো ভালো করেই জানো নারীদের প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই এবং আমরা কী চাই তাও তুমি জানো।'
অসহায় নবীর এই চরম সংকটের মুহূর্তে ফেরেশতাগণ তাঁদের মূল পরিচয় প্রকাশ করলেন। তাঁরা বললেন, 'হে লূত! ভয় পাবেন না, আমরা আপনার প্রতিপালকের প্রেরিত ফেরেশতা। এই পাপিষ্ঠরা কখনো আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।' হযরত জিব্রাঈল (আ.) তাঁর ডানার সামান্য ঝাপটা দিয়ে লূত (আ.)-এর ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা উন্মত্ত ভিড়ের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে অন্ধ করে দিলেন। পাপিষ্ঠরা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রাচীরে ধাক্কা খেতে খেতে পালিয়ে গেল এবং হুমকি দিয়ে গেল যে সকালে তারা দেখে নেবে।
ফেরেশতারা লূত (আ.)-কে নির্দেশ দিলেন, রাতের শেষ প্রহরে তিনি যেন তাঁর ঈমানদার পরিবারকে নিয়ে জনপদ ত্যাগ করেন এবং পরিবারের কেউ যেন পেছনের দিকে ফিরে না তাকায়। তবে লূত (আ.)-এর স্ত্রী কাফেরদের সহযোগী হওয়ায় তার ওপরও আযাব নির্ধারিত ছিল। নির্ধারিত সময়ে লূত (আ.) তাঁর দুই কন্যা ও অনুসারীদের নিয়ে শহর ত্যাগ করলেন। প্রভাতের আলো ফুটতেই আল্লাহর অভিশাপ ও চূড়ান্ত আযাব সাদূম নগরীর ওপর আপতিত হলো। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে: 'অতঃপর যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছাল, তখন আমি উক্ত জনপদকে উল্টে ওপর-নিচ করে দিলাম এবং তাদের ওপর স্তরে স্তরে পোড়ামাটির পাথর বর্ষণ করলাম, যা আপনার প্রতিপালকের নিকট চিহ্নিত ছিল' (সূরা হূদ: ৮২-৮৩)। তাফসীরে ইবনে কাসীরে বর্ণিত হয়েছে, হযরত জিব্রাঈল (আ.) তাঁর ডানার অগ্রভাগ দিয়ে পুরো ভূখণ্ডকে উপড়ে আকাশের কাছাকাছি তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, যার ফলে আসমানের ফেরেশতারা তাদের কুকুরের ডাক শুনতে পাচ্ছিল; এরপর সম্পূর্ণ জনপদকে উপুড় করে মাটিতে নিক্ষেপ করা হয়। একই সাথে আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো নিক্ষিপ্ত হতে থাকে চিহ্নিত সালফার ও জ্বলন্ত পাথরের বৃষ্টি, যা পলায়নরত প্রতিটি পাপিষ্ঠের মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। লূত (আ.)-এর স্ত্রী আযাবের বিকট শব্দ শুনে পেছনের দিকে তাকালে একটি পাথর এসে তাকেও সাথে সাথে ধ্বংস করে দেয়। সমগ্র উপত্যকাটি চিরদিনের জন্য একটি দুর্গন্ধময়, লবণাক্ত ও নির্জীব জলাশয়ে পরিণত হয়, যা আজ 'মৃত সাগর' নামে পৃথিবীর বুকে এক জ্বলন্ত শিক্ষণীয় নিদর্শন হয়ে টিকে রয়েছে।
======================================================================
বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ (KEY PRACTICAL LESSONS)
======================================================================
(1) [ঈমান ও দ্বীনি আনুগত্য] রক্তের সম্পর্ক নয়, বরং ঈমানই হলো মুমিনের মূল আত্মীয়তা।
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: লূত (আ.)-এর স্ত্রী একজন সম্মানিত নবীর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কুফর ও পাপের সাথে আপস করার কারণে ধ্বংস থেকে রক্ষা পায়নি। দ্বীনের ব্যাপারে বংশমর্যাদা কোনো উপকারে আসে না যদি অন্তরে খাঁটি ঈমান ও আনুগত্য না থাকে।
(2) [নৈতিকতা ও স্বভাব-সুরক্ষা] প্রাকৃতিক ও শারীরিক বিধানের বিকৃতি সমাজের ওপর ঐশ্বরিক ধ্বংস ডেকে আনে।
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: আল্লাহ তাআলা নারী ও পুরুষের স্বভাবসম্মত সম্পর্কের যে বিধান নির্ধারণ করেছেন, তার বিপরীত বিকৃত যৌনাচার ও সমকামিতা মানবসভ্যতার মূল অস্তিত্বের পরিপন্থী। সাদূমবাসীদের ওপর এমন ভয়াবহ আযাব নেমে এসেছিল যা অন্য কোনো জাতির ওপর আসেনি, যা এই পাপের ভয়াবহতা প্রমাণ করে।
(3) [আমরে বিল মারুফ ও নাহী আনিল মুনকার] পাপের বিস্তার রোধে প্রকাশ্য প্রতিবাদ করা এবং নিষ্ক্রিয় না থাকা অপরিহার্য।
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: হযরত লূত (আ.) একাকী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সম্প্রদায়ের সম্মিলিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীকভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। অন্যায় দেখে নীরব থাকা বা তাতে সমর্থন দেওয়া পরোক্ষভাবে আল্লাহর গজবকে আহ্বান করার শামিল।
(4) [আল্লাহর ন্যায়বিচার ও প্রতিশ্রুতি] আল্লাহর আযাব বিলম্বিত হলেও জালিমদের সমূলে ধ্বংস অনিবার্য।
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: পাপীরা সাময়িক অবকাশ পেলেও আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিস্তার পায় না। ভোর হওয়ার যে ওয়াদা ফেরেশতারা লূত (আ.)-কে করেছিলেন, তা প্রমাণ করে আল্লাহর নির্ধারিত সময় কখনো এদিক-ওদিক হয় না।
