ইসলামিক ঘটনা

ইসলামিক ঘটনা

শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।

← সব ঘটনা

হযরত ইউসুফ (আ.) এর স্বপ্ন ও ভাইদের হিংসার শিকার হওয়া

পবিত্র কুরআনের বর্ণনানুসারে, কাহিনীর সূচনা ঘটে এক অসাধারণ স্বপ্নের মাধ্যমে। একদিন ইউসুফ (আ.) এসে তাঁর পিতা ইয়াকুব (আ.)-কে বিনম্র শ্রদ্ধায় বললেন, 'হে আমার পিতা! আমি স্বপ্নে দেখেছি এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য এবং চাঁদ—আমি দেখেছি তারা সবাই আমাকে সিজদা করছে।' (সূরা ইউসুফ, ১২:৪)। ইয়াকুব (আ.) ছিলেন আল্লাহর একজন বিজ্ঞ নবী। তিনি অবিলম্বে অনুধাবন করলেন যে, এগারোটি নক্ষত্র হলো ইউসুফের এগারো ভাই এবং সূর্য ও চাঁদ হলো পিতা-মাতা। সিজদা দ্বারা সম্মান প্রদর্শন বোঝানো হয়েছে। তিনি বুঝলেন, ইউসুফকে আল্লাহ তা'আলা নবুওয়াত, স্বপ্ন ব্যাখ্যার জ্ঞান এবং এক সুমহান মর্যাদায় অভিষিক্ত করবেন।

পিতা হিসেবে তিনি যেমন আনন্দিত হলেন, তেমনি একজন দূরদর্শী নবী হিসেবে ভাইদের অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থা সম্পর্কেও তিনি পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তিনি স্নেহমাখা কণ্ঠে সতর্ক করে বললেন, 'হে আমার বৎস! তোমার এই স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে প্রকাশ করো না; নতুবা তারা তোমার বিরুদ্ধে মারাত্মক চক্রান্ত ফাঁদবে। নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।' (সূরা ইউসুফ, ১২:৫)।

কিন্তু শয়তানের কুমন্ত্রণা ভাইদের অন্তরে আগে থেকেই বাসা বেঁধেছিল। তারা দেখতে পাচ্ছিল যে, পিতা তাদের মতো শক্তিশালী ও উপার্জনক্ষম দল থাকা সত্ত্বেও ইউসুফ ও তার ছোট ভাই বেনিয়ামিনকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। তারা নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ শুরু করল। কুরআনের ভাষায় তারা বলল, 'ইউসুফ এবং তার ভাই আমাদের পিতার কাছে আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একটি শক্তিশালী দল। নিশ্চয় আমাদের পিতা সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছেন।' (সূরা ইউসুফ, ১২:৮)। হিংসার আগুন তাদের বিচারবুদ্ধি গ্রাস করে ফেলল। তাদের মধ্য থেকে চরমপন্থীরা প্রস্তাব দিল, 'ইউসুফকে হত্যা করো অথবা তাকে কোনো সুদূর নির্জন স্থানে ফেলে আসো, যাতে পিতার দৃষ্টি কেবল তোমাদের প্রতিই নিবিষ্ট হয় এবং এরপর তোমরা তওবা করে সৎ লোক হয়ে যাবে।' কিন্তু তাদের মধ্য থেকে একজন তুলনামূলক সংযত ভাই (তাফসীরবিদদের মতে রুবিল বা ইয়াহুদা) বলল, 'ইউসুফকে হত্যা করো না; যদি কিছু করতেই হয়, তবে তাকে কোনো অন্ধকার কূপে নিক্ষেপ করো, কোনো পথিক কাফেলা এসে তাকে তুলে নিয়ে যাবে।' (সূরা ইউসুফ, ১২:৯-১০)।

চক্রান্ত চূড়ান্ত করে তারা পিতার কাছে উপস্থিত হলো। অত্যন্ত বিনয় ও কৃত্রিম দরদ দেখিয়ে তারা বলল, 'হে আমাদের পিতা! আপনার কী হলো যে ইউসুফের ব্যাপারে আপনি আমাদের বিশ্বাস করেন না? অথচ আমরা তো তার একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী। আগামীকাল তাকে আমাদের সাথে চারণভূমিতে পাঠান; সে আনন্দ করবে, খেলবে এবং আমরা অবশ্যই তার পূর্ণ হেফাজত করব।' ইয়াকুব (আ.) তাদের মনের গোপন হিংসা আঁচ করতে পেরে অনিচ্ছা প্রকাশ করে বললেন, 'তোমাদের তাকে নিয়ে যাওয়া আমাকে ব্যথিত করে এবং আমি আশঙ্কা করি যে, তোমরা যখন অসাবধান থাকবে, তখন নেকড়ে বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলবে।' চক্রান্তকারী ভাইয়েরা অহংকার প্রকাশ করে বলল, 'আমরা একটি শক্তিশালী দল থাকা সত্ত্বেও যদি বাঘে তাকে খেয়ে ফেলে, তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্ত ও অপদার্থ হিসেবে গণ্য হব।' (সূরা ইউসুফ, ১২:১১-১৪)।

অবশেষে পিতার অনিচ্ছা সত্ত্বেও পীড়াপীড়ির মুখে ইয়াকুব (আ.) ইউসুফকে তাদের সাথে যেতে অনুমতি দিলেন। চারণভূমিতে পৌঁছামাত্রই তাদের ছদ্মবেশ খসে পড়ল। তারা নিষ্পাপ ইউসুফের ওপর নির্মম আচরণ শুরু করল এবং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একটি পরিত্যক্ত, গভীর ও অন্ধকার কূপে তাঁকে নিক্ষেপ করল। এই চরম অসহায় ও ভীতিপ্রদ মুহূর্তে মহান আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-এর অন্তরে অহী অবতীর্ণ করে অভয় দিলেন, 'তুমি অবশ্যই একদিন তাদের এই কৃতকর্মের কথা এমন এক পরিস্থিতিতে স্মরণ করিয়ে দেবে, যখন তারা তোমার পরিচয় অনুধাবনও করতে পারবে না।' (সূরা ইউসুফ, ১২:১৫)। আল্লাহর এই সান্ত্বনা ছিল ইউসুফ (আ.)-এর অন্তরের জন্য এক পরম আশ্রয়।

এরপর চক্রান্তের প্রমাণ হিসেবে তারা ইউসুফের জামাটি খুলে রেখে একটি বকরির বাচ্চা জবাই করে সেই রক্ত জামায় মেখে নিল। সন্ধ্যাবেলায় তারা কৃত্রিম কান্নার ভান করতে করতে পিতার কাছে ফিরে এলো। তারা আহাজারি করে বলল, 'হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড়ের প্রতিযোগিতা করছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম, এমন সময় নেকড়ে বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু আমরা সত্য বললেও আপনি তো আমাদের বিশ্বাস করবেন না।' তারা সেই রক্তমাখা জামা পিতার সামনে মেলে ধরল। প্রজ্ঞাবান ইয়াকুব (আ.) জামাটি পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন, রক্ত লেগে আছে ঠিকই কিন্তু জামার কোথাও নেকড়ের নখ বা দাঁতের কোনো ছিন্নভিন্ন চিহ্ন নেই। তিনি তৎক্ষণাৎ তাদের মিথ্যা ধরে ফেললেন এবং অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, 'বরং তোমাদের প্রবৃত্তি তোমাদের জন্য একটি মন্দ কাজকে শোভনীয় করে দেখিয়েছে। সুতরাং আমার একমাত্র কর্তব্য হলো সুন্দর ধৈর্য (সবরুন জামিল) ধারণ করা। আর তোমরা যা বলছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।' (সূরা ইউসুফ, ১২:১৬-১৮)। এভাবে হিংসার চক্রান্তের মধ্য দিয়ে শুরু হলো ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের এক অগ্নিপরীক্ষা, যা শেষ পর্যন্ত তাঁকে মিশরের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।

======================================================================

বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ (KEY PRACTICAL LESSONS)

======================================================================

(1) [আত্মশুদ্ধি ও চারিত্রিক শিক্ষা] হিংসা ও ঈর্ষা মানুষের দ্বীন ও নৈতিকতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: ইউসুফ (আ.)-এর সৎ ভাইয়েরা ছিলেন নবীপুত্র, তা সত্ত্বেও হিংসার বশবর্তী হয়ে তারা নিজ নিরপরাধ ছোট ভাইকে হত্যা বা কূপে ফেলে দেওয়ার মতো জঘন্য চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে ধ্বংস করে দেয় যেমন আগুন কাঠকে ভস্মীভূত করে।

(2) [ব্যবহারিক হিকমত ও সতর্কতা] আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত ও সুসংবাদ সবার কাছে প্রকাশ না করা প্রজ্ঞার দাবি।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: ইয়াকুব (আ.) ইউসুফ (আ.)-কে তাঁর স্বপ্নের কথা ভাইদের কাছে প্রকাশ করতে নিষেধ করেছিলেন। এতে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, আল্লাহ কাউকে বিশেষ কোনো মর্যাদা বা নিয়ামত দিলে তা এমন মানুষের সামনে প্রকাশ করা উচিত নয় যাদের হিংসুক হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

(3) [সন্তান প্রতিপালন ও পারিবারিক নীতি] সন্তানদের মধ্যে ভালোবাসার প্রকাশে পিতা-মাতার সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সমদর্শিতা অবলম্বন করা জরুরি।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: যদিও অন্তরের গভীর ভালোবাসার ওপর মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তবুও বাহ্যিক আচরণ ও উপহারের ক্ষেত্রে সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা করা অপরিহার্য; নতুবা বঞ্চিত মনে করা সন্তানদের মনে ঈর্ষা ও ভ্রাতৃঘাতী শত্রুতা জন্ম নিতে পারে।

(4) [ঈমান ও তাওয়াক্কুল] বিপদের চরম মুহূর্তে 'সবরুন জামিল' বা অভিযোগহীন সুন্দর ধৈর্যই মুমিনের শ্রেষ্ঠ আশ্রয়।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: হযরত ইয়াকুব (আ.) প্রিয় পুত্রকে হারিয়ে মানুষের কাছে আহাজারি না করে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে বলেছিলেন 'ফাসাবরুন জামিল'। আল্লাহমুখী এই অবিচল ধৈর্য শেষ পর্যন্ত তাঁকে হারানো পুত্রদের পুনরায় ফিরে পাওয়ার পথ সুগম করেছিল।

(5) [আল্লাহর তাগদীর ও সার্বভৌম পরিকল্পনা] মানুষ যা চক্রান্ত করে, আল্লাহর পরিকল্পনা তার চেয়েও বহু ঊর্ধ্বে এবং অনিবার্য।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: ভাইয়েরা ইউসুফকে কূপে ফেলে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের সেই চক্রান্তই অলক্ষ্যে ইউসুফকে মিশরের রাজপ্রাসাদ এবং পরবর্তীতে মিশরের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর সোপান বানিয়ে দেয়। আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তা বাস্তবায়ন করেই ছাড়েন।

← সব ঘটনা

Scroll to Top