ইসলামিক ঘটনা
শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।
কূপের অন্ধকার থেকে মিশরের আযীযের প্রাসাদে ইউসুফ (আ.)
হযরত ইউসুফ (আ.) শৈশবে এক অপূর্ব ও অলৌকিক স্বপ্ন প্রত্যক্ষ করেন—এগারোটি নক্ষত্র এবং সূর্য ও চন্দ্র তাঁকে সিজদা করছে। তিনি এই স্বপ্নের কথা তাঁর পিতা হযরত ইয়াকুব (আ.)-কে জানালে প্রজ্ঞাবান পিতা বুঝতে পারেন যে, তাঁর এই পুত্রকে আল্লাহ নবুওয়াত ও মর্যাদার এক বিশাল আসনে অধিষ্ঠিত করবেন। তিনি স্নেহের সাথে পুত্রকে সতর্ক করে বলেন, 'হে আমার বৎস! তোমার এই স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে প্রকাশ করো না; নতুবা তারা তোমার বিরুদ্ধে মারাত্মক ষড়যন্ত্র করবে। নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।' (সূরা ইউসুফ: ৫)। এদিকে ইউসুফ (আ.) ও তাঁর সহোদর বেনিয়ামিনের প্রতি পিতার গভীর ভালোবাসা দেখে বৈমাত্রেয় ভাইয়েরা তীব্র হিংসায় জ্বলতে থাকে। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল যে, 'আমাদের পিতার দৃষ্টিতে ইউসুফ ও তার ভাই-ই সবচেয়ে প্রিয়, অথচ আমরা একটি শক্তিশালী দল।' তারা সিদ্ধান্ত নিল, পিতার মনোযোগ সম্পূর্ণ নিজেদের দিকে টানতে ইউসুফকে হত্যা করতে হবে অথবা কোনো দূর দেশে ফেলে আসতে হবে। তবে তাদের মধ্য থেকে এক ভাই কিছুটা নরম সুর তুলে পরামর্শ দিল, 'তোমরা ইউসুফকে হত্যা করো না; বরং যদি কিছু করতেই চাও, তবে তাকে কোনো অন্ধকূপের গভীরে ফেলে দাও, যাতে কোনো পথচারী কাফেলা তাকে তুলে নিয়ে যায়।' ভাইয়েরা ইয়াকুব (আ.)-এর কাছে এসে কপট আকুতি জানিয়ে বলল, তারা ইউসুফকে আনন্দভ্রমণ ও খেলাধুলার জন্য মাঠে নিয়ে যেতে চায় এবং তারা তার পূর্ণ নিরাপত্তা দেবে। পিতা প্রথমে নেকড়ে বাঘের ভয়ের কথা উল্লেখ করে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও ভাইদের জোরালো আশ্বাসে শেষ পর্যন্ত অনুমতি দেন। মাঠে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের নিষ্ঠুর রূপ প্রকাশ পায়। তারা ইউসুফ (আ.)-এর জামা খুলে নেয় এবং কোনো মায়ামমতা না দেখিয়ে তাঁকে এক অন্ধকার, গভীর ও পানির স্তূপহীন শুষ্ক কূপে নিক্ষেপ করে। ঠিক সেই নিঃসঙ্গ ও ভীতিকর মুহূর্তে মহান আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-এর ওপর ওহী নাযিল করে তাঁর হৃদয়কে শান্ত করলেন: 'তুমি অবশ্যই একদিন তাদের এই কৃতকর্মের কথা এমন এক অবস্থায় প্রকাশ করে দেবে, যখন তারা তোমাকে চিনতেও পারবে না।' (সূরা ইউসুফ: ১৫)। ভাইয়েরা একটি ছাগল জবাই করে তার রক্ত ইউসুফের জামায় মাখিয়ে সন্ধ্যার সময় কাঁদতে কাঁদতে পিতার কাছে ফিরে গেল। তারা দাবি করল, তারা যখন দৌড় প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত ছিল, তখন নেকড়ে এসে ইউসুফকে খেয়ে ফেলেছে। রক্তাক্ত জামা দেখে প্রজ্ঞাবান নবী ইয়াকুব (আ.) বুঝতে পারলেন এটি এক বানোয়াট মিথ্যাচার; কারণ নেকড়ে যদি ইউসুফকে চিবিয়ে খেত, তবে জামাটি অক্ষত ও ছেঁড়াহীন থাকত না। বুকভাঙ্গা কান্না চেপে ইয়াকুব (আ.) বললেন, 'বরং তোমাদের প্রবৃত্তি তোমাদের জন্য একটি মন্দ কাজকে শোভনীয় করেছে। সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই আমার একমাত্র অবলম্বন (সবরে জামিল), আর তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে কেবল আল্লাহর সাহায্যই প্রার্থনীয়।' এদিকে কূপে অবস্থানরত ইউসুফ (আ.)-এর পথ উন্মোচিত হয় এক মুসাফির কাফেলার মাধ্যমে। সিরিয়া থেকে মিশরগামী একটি বণিকদল সেখানে যাত্রাবিরতি করে এবং কূপ থেকে পানি উত্তোলনের জন্য তাদের পানি সংগ্রাহককে পাঠায়। লোকটি যখন বালতি নামিয়ে দিল, ইউসুফ (আ.) রশি ধরে ওপরে উঠে এলেন। বালতিতে এক অনিন্দ্যসুন্দর বালককে দেখে লোকটি আনন্দে চিৎকার করে উঠল, 'কী আনন্দের সংবাদ! এ তো এক অপূর্ব কিশোর!' কাফেলাটি তাঁকে লুকিয়ে রাখল বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বিক্রির উদ্দেশ্যে। পরবর্তীতে সামান্য কিছু দিরহামের বিনিময়ে তারা তাঁকে মিশরের দাসবাজারে অত্যন্ত সস্তা মূল্যে বিক্রি করে দিল; কারণ এই কিশোর সম্পর্কে তাদের কোনো মর্যাদা বা ভবিষ্যৎ মূল্যের ধারণা ছিল না। কিন্তু বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। মিশরের অন্যতম শীর্ষ প্রভাবশালী মন্ত্রী তথা রাজকোষাধ্যক্ষ 'আযীযে মিসর' তাঁকে ক্রয় করলেন। তিনি ইউসুফ (আ.)-এর নিষ্কলুষ চেহারা ও মহিমান্বিত অবয়ব দেখে মুগ্ধ হয়ে নিজ স্ত্রীকে নির্দেশ দিলেন, 'এর থাকার সম্মানজনক ব্যবস্থা করো; হয়তো সে আমাদের কোনো উপকারে আসবে কিংবা আমরা তাকে দত্তক হিসেবে পুত্র বানিয়ে নেব।' এভাবেই মহান আল্লাহ কূপের অন্ধকার ও দাসের শৃৃঙ্খল ভেদ করে ইউসুফ (আ.)-কে রাজপ্রাসাদের মর্যাদাপূর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করলেন, যেন তাঁকে বাস্তব বিষয়ের সঠিক ব্যাখ্যা ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়া যায়। নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ তাঁর সকল কাজে বিজয়ী, যদিও অধিকাংশ মানুষ তা উপলব্ধি করতে পারে না।
======================================================================
বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ (KEY PRACTICAL LESSONS)
======================================================================
(1) [ঈমান ও তাওয়াক্কুল] আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ ও অলৌকিক ব্যবস্থাপনা
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: মানুষের তৈরি চরম ষড়যন্ত্র ও ধ্বংসের ফাঁদও আল্লাহর অমোঘ ফয়সালার সামনে পরাস্ত হতে বাধ্য। ভাইয়েরা যেখানে ইউসুফ (আ.)-কে শেষ করে দিতে চেয়েছিল, আল্লাহ সেই গভীর কূপকেই তাঁর সিংহাসনের প্রথম সিঁড়িতে পরিণত করেন।
(2) [চরিত্র গঠন ও নৈতিকতা] হিংসার সর্বনাশা পরিণতি থেকে আত্মরক্ষা
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: হিংসা এমন এক বিষাক্ত ব্যাধি যা আপন রক্তের সম্পর্কের পবিত্রতাকেও মুহূর্তে মুছে দেয়। মুমিনকে অবশ্যই অন্তর থেকে ঈর্ষা দূর করতে হবে, নতুবা তা মানুষকে মারাত্মক পাপের দিকে ধাবিত করে।
(3) [পরীক্ষা ও আত্মিক উন্নতি] বিপদে 'সবরে জামিল' বা অনুপম ধৈর্যের আশ্রয়
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: হযরত ইয়াকুব (আ.) চরম হৃদয়বিদারক সংবাদেও মানুষের কাছে কোনো অভিযোগ না করে মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করেছিলেন। কঠিনতম সংকটেও ধৈর্য ও আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনাই মুমিনের আসল হাতিয়ার।
(4) [পারিবারিক জীবন ও প্যারেন্টিং] সন্তানদের লালন-পালনে প্রজ্ঞা ও সতর্কতা
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: সন্তানদের মধ্যে ভালোবাসার ক্ষেত্রে বাহ্যিক প্রকাশে সতর্ক থাকা এবং কারো অতিরিক্ত প্রতিভায় যেন অন্যরা ঈর্ষান্বিত না হয়, সে বিষয়ে অভিভাবকদের অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী হতে হয়।
(5) [আল্লাহর সন্তুষ্টি ও প্রতিশ্রুতি] অন্ধকারময় পরিস্থিতির পেছনে লুকায়িত রহমত
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: জীবনের সাময়িক ব্যর্থতা, লাঞ্ছনা বা প্রতিকূলতা কখনো কখনো বিশাল কোনো মর্যাদা বা সাফল্যের পূর্বাভাস মাত্র। বান্দার কাজ হলো অন্ধকার পরিস্থিতিতেও আল্লাহর রহমতের ওপর অবিচল আস্থা রাখা।
