ইসলামিক ঘটনা
শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।
মাছের পেটে ইউনুস (আ.) ও লা ইলাহা ইল্লা আনতা দোয়া পাঠ
হযরত ইউনুস (আ.) নিনেভে নগরীর অধিবাসীদের এক আল্লাহর ইবাদত করার এবং পৌত্তলিকতা ত্যাগের আহ্বান জানান। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি তাদের হিদায়াতের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, কিন্তু সম্প্রদায়টি অহংকারবশত তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে অবাধ্যতায় অনড় থাকে। তাদের অবিচল ঔদ্ধত্য দেখে ইউনুস (আ.) ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হন এবং তাদেরকে তিন দিনের মধ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব আসার সতর্কবার্তা প্রদান করেন। তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরত বা প্রস্থানের সুস্পষ্ট ওহী আসার পূর্বেই তিনি নিজ দায়িত্বের পরিসমাপ্তি মনে করে ক্রোধবশত জনপদ ত্যাগ করেন—কুরআনে যাকে 'মুগাদিবা' (ক্রোধভরে প্রস্থান) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউনুস (আ.) চলে যাওয়ার পর নিনেভেবাসী আযাবের প্রাথমিক লক্ষণসমূহ প্রত্যক্ষ করে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাদের অন্তরে ঈমানের উদয় হয়; তারা দাস-দাসী, সন্তান-সন্ততি এমনকি গৃহপালিত পশুদের নিয়ে খোলা ময়দানে উপস্থিত হয়ে অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর সমীপে ক্রন্দন ও খাঁটি তওবা করে। তাদের এই অকপট তওবার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর থেকে নির্ধারিত আযাব প্রত্যাহার করে নেন, যা কুরআনে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
এদিকে ইউনুস (আ.) সমুদ্রতীরে পৌঁছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আরোহণ করেন। জাহাজটি গভীর সমুদ্রে পৌঁছালে হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড়-তুফানের কবলে পড়ে এবং অতিরিক্ত বোঝাইয়ের কারণে ডুবতে বসে। জাহাজের আরোহীরা সিদ্ধান্ত নেয় যে, জাহাজের ভার লাঘব করতে লটারির (কুরআ) মাধ্যমে একজনকে সাগরে নিক্ষেপ করা হবে। লটারি করা হলে বারবার ইউনুস (আ.)-এর নাম উঠে আসে। তাঁর ন্যায়পরায়ণতা দেখে সঙ্গীরা দ্বিধাবোধ করলেও তিনি আল্লাহর ফয়সালা মেনে নিয়ে নিজেকে সাগরে সমর্পণ করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এক বিশাল সামুদ্রিক মাছকে (হূত) নির্দেশ দেন যেন সে ইউনুস (আ.)-কে গ্রাস করে, কিন্তু তাঁর হাড় বা গোশতের যেন কোনো ক্ষতি না করে। ফলে তিনি মাছের উদরে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় বন্দি হন। সেখানে তিনি ত্রিবিধ অন্ধকারের সম্মুখীন হন—রাতের অন্ধকার, গভীর সমুদ্রের অন্ধকার এবং মাছের পেটের অন্ধকার। এই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে তিনি উপলব্ধি করেন যে, ঐশী অনুমতির পূর্বে প্রস্থান করা তাঁর একটি অনভিপ্রেত ত্রুটি ছিল। সাগরের গভীর তলদেশে পাথর ও জলজ প্রাণীদের তাসবীহ পাঠ শুনে ইউনুস (আ.) গভীর অনুশোচনায় মগ্ন হন এবং সেই ঐতিহাসিক প্রার্থনা উচ্চারণ করেন:
'লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যলিমীন'—(হে আল্লাহ! তুমি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, তুমি পরম পবিত্র; নিশ্চয় আমি সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত)।
আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীজির এই একনিষ্ঠ তাসবীহ ও আত্মসমর্পণ কবুল করেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, যদি তিনি তাসবীহ পাঠকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হতেন, তবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত তাকে মাছের পেটেই অবস্থান করতে হতো। আল্লাহর আদেশে মাছটি ইউনুস (আ.)-কে একটি বৃক্ষহীন বালুকাময় উপকূলে নিক্ষেপ করে। তখন তিনি ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল, অসুস্থ ও পিপাসার্ত। তাঁর ছায়া ও আশ্রয়ের জন্য পরম করুণাময় আল্লাহ সেখানে অলৌকিকভাবে একটি লাউ জাতীয় লতানো গাছ (ইয়াকতীন) অঙ্কুরিত করেন, যা তাঁর শরীরকে রোদ ও মাছি থেকে রক্ষা করে। সুস্থ হয়ে ফিরে আসার পর তিনি দেখতে পান তাঁর সেই এক লক্ষাধিক অনুসারী সবাই ঈমান এনেছে এবং আল্লাহ তাদের এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত সুখ-শান্তি দান করেছেন।
======================================================================
বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ (KEY PRACTICAL LESSONS)
======================================================================
(1) [তাওহীদ ও দু'আ] লা ইলাহা ইল্লা আনতা দু'আটির সার্বজনীন কার্যকারিতা
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: এই প্রার্থনায় তিনটি মৌলিক উপাদান রয়েছে: তাওহীদের সাক্ষ্য, আল্লাহর পবিত্রতা ও ত্রুটিহীনতার ঘোষণা, এবং নিজের দুর্বলতা ও অপরাধের অকপট স্বীকারোক্তি। যে কোনো মুমিন চরম সংকটে এই বাক্যে প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা কবুল করেন।
(2) [ধৈর্য ও দাঈর দায়িত্ব] কঠিন পরিস্থিতিতেও দাওয়াতি কাজে অটল ধৈর্য প্রদর্শন
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও অনুমতি ব্যতীত দাওয়াতি ময়দান বা অর্পিত আমানত পরিত্যাগ করা উচিত নয়। দাঈদের জন্য প্রতিকূলতা সত্ত্বেও চরম ধৈর্য ও সবর অবলম্বন করা অপরিহার্য।
(3) [ইবাদতের পূর্বপ্রস্তুতি] সুখের দিনে আল্লাহর স্মরণ বিপদের দিনে উদ্ধারের পথ খুলে দেয়
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: ইউনুস (আ.) পূর্ব থেকেই নিয়মিত তাসবীহ ও আল্লাহর যিকিরে অভ্যস্ত ছিলেন বলেই চরম বিপদে তাঁর দু'আ দ্রুত কবুল হয়েছিল। সুস্থ ও সচ্ছল অবস্থায় আল্লাহর নৈকট্য অর্জন কঠিন মুহূর্তে সহায়ক হয়।
(4) [তওবা ও ক্ষমা] আন্তরিক অনুশোচনার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত লাভ ও শাস্তি নিবারণ
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: নিনেভেবাসীর ইতিহাস শিক্ষা দেয় যে, আযাব আসার পূর্বমুহূর্তেও যদি কোনো জাতি সম্মিলিতভাবে ও নিখাদ অন্তরে পাপের পথ পরিহার করে তাওহীদের দিকে ফিরে আসে, তবে আল্লাহ তাঁর শাস্তি প্রত্যাহার করে নেন।
