ইসলামিক ঘটনা

ইসলামিক ঘটনা

শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।

← সব ঘটনা

হযরত মূসা (আ.) এর জন্ম ও নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার অলৌকিক ইতিহাস

হযরত মূসা (আ.) যখন তাঁর পুণ্যবতী মাতার গর্ভে আসেন, তখন থেকেই তাঁর মা চরম উদ্বেগের মধ্যে দিনাতিপাত করছিলেন। তবে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে গর্ভাবস্থায় কোনো প্রকাশ্য লক্ষণ ফুটে ওঠেনি, যার ফলে ফেরাউনের গোয়েন্দারা তা টের পায়নি। নির্ধারিত সময়ে শিশু মূসা (আ.) পৃথিবীতে আগমন করলেন। পুত্রের নিষ্পাপ মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে একদিকে মায়ের বুক ভালোবাসায় ভরে উঠল, অন্যদিকে ফেরাউনের জল্লাদদের ভয়ে তাঁর অন্তর কেঁপে উঠল। ঠিক এই সংকটকালে রাব্বুল আলামীন মূসার মাতার অন্তরে এক বিশেষ ওহী বা ইলহাম নাযিল করলেন। আল্লাহ তাআলা সূরা আল-ক্বাসাসের ৭ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন: 'আমি মূসার মায়ের অন্তরে নির্দেশ দিলাম যে, তুমি তাকে স্তন্যদান করতে থাক। অতঃপর যখন তুমি তার সম্পর্কে আশঙ্কা করবে, তখন তাকে নদীতে নিক্ষেপ কর এবং ভয় পেয়ো না, বিষণ্ণও হয়ো না। নিশ্চয় আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসুলদের অন্তর্ভুক্ত করব।'

ঐশী আশ্বাস পেয়ে মূসা (আ.)-এর মাতা কালবিলম্ব না করে একটি কাঠের সিন্দুক প্রস্তুত করলেন। সিন্দুকের ভেতরটা নরম কাপড়ে সাজিয়ে শিশু মূসাকে তাতে শুইয়ে সযত্নে ঢাকনা বন্ধ করে দিলেন এবং চোখের অশ্রু সংবরণ করে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে উত্তাল নীল নদের জলে তা ভাসিয়ে দিলেন। তীব্র স্রোতের মুখে এক অসহায় নবজাতক ভেসে চলেছে—দৃশ্যটি বাহ্যত চরম বিপদের মনে হলেও সিন্দুকটির প্রকৃত পরিচালক ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। সিন্দুকটি ভাসতে ভাসতে ফেরাউনের রাজপ্রাসাদের নিজস্ব ঘাটে গিয়ে পৌঁছাল। প্রাসাদের পরিচারিকারা সিন্দুকটি দেখতে পেয়ে তুলে আনল এবং ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিমের সামনে উপস্থাপন করল।

সিন্দুকের ঢাকনা খোলার সাথে সাথে আসিয়ার দৃষ্টি পড়ল এক জ্যোতির্ময় শিশুর ওপর। আল্লাহ তাআলা শিশু মূসার চেহারায় এমন এক ঐশী আকর্ষণ ও মোহময় ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিলেন যে, যে কেউই তাঁর দিকে তাকাত, সে-ই তাঁকে ভালোবেসে ফেলত। আল্লাহ তাআলা সূরা তা-হার ৩৯ নম্বর আয়াতে বলেন: 'আর আমি আমার পক্ষ থেকে তোমার ওপর ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম, যাতে তুমি আমার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হও।' শিশুটিকে দেখেই ফেরাউনের স্ত্রী পরম মমতায় বুকে টেনে নিলেন। কিন্তু ফেরাউন যখন জানতে পারল যে এটি বনি ইসরাঈলের এক নবজাতক, তখন সে পূর্বের নির্দেশ অনুযায়ী তাকে হত্যা করার ইচ্ছা প্রকাশ করল। তখন মহীয়সী নারী আসিয়া দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে বললেন: 'সে আমার ও তোমার চক্ষু শীতলকারী; একে হত্যা করো না, হয়তো সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা তাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করব' (সূরা আল-ক্বাসাস: ৯)। নিঃসন্তান আসিয়ার এই অনুনয়ে ফেরাউনের নিষ্ঠুর হৃদয় নমনীয় হলো এবং শিশুটি প্রাণে বেঁচে গেল।

এদিকে মূসা (আ.)-এর মায়ের বুক ছিল শূন্যতায় হাহাকারময়। কুরআনের বর্ণনায়: 'মূসার মায়ের হৃদয় ব্যাকুল ও শূন্য হয়ে পড়ল। যদি না আমি তার অন্তরকে সুদৃঢ় করে দিতাম, তবে সে তো এই গোপন বিষয়টি প্রকাশই করে দিত' (সূরা আল-ক্বাসাস: ১০)। তিনি তাঁর কন্যা মারইয়ামকে নির্দেশ দিলেন সিন্দুকের গতিবিধি দূর থেকে অনুসরণ করতে। মারইয়াম অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে অচেনা পথিকের বেশে দূর থেকে দেখতে পেলেন যে সিন্দুকটি রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেছে।

এদিকে রাজপ্রাসাদে এক অভূতপূর্ব সংকট সৃষ্টি হলো। ক্ষুধার্ত শিশু মূসা অবিরাম কাঁদছেন, কিন্তু রাজপ্রাসাদে ডেকে আনা কোনো ধাত্রী নারীর স্তন তিনি মুখে নিচ্ছেন না। আল্লাহ তাআলা পূর্ব থেকেই তাঁর ওপর অন্যান্য নারীদের দুধ হারাম করে দিয়েছিলেন। ঠিক এই মুহূর্তে আল্লাহর অমোঘ পরিকল্পনা অনুযায়ী মূসার বোন ভিড়ের মধ্য থেকে রাজদরবারে প্রবেশ করে বিনয়ের সাথে নিবেদন করলেন: 'আমি কি তোমাদের এমন এক পরিবারের সন্ধান দেব, যারা তোমাদের জন্য একে লালন-পালন করবে এবং তার শুভাকাঙ্ক্ষী হবে?' (সূরা আল-ক্বাসাস: ১২)। প্রাসাদের লোকেরা অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে তাকে দ্রুত সেই ধাত্রীকে নিয়ে আসার অনুমতি দিল। ভগ্নি মারইয়াম কালবিলম্ব না করে নিজ মাতাকে রাজপ্রাসাদে ডেকে নিয়ে এলেন।

মূসার মাতাকে প্রাসাদে এনে যখন শিশু মূসার কোলে দেওয়া হলো, শিশুটি তাঁর চিরচেনা মায়ের ঘ্রাণ পেয়ে পরম তৃপ্তিতে স্তন্যপান শুরু করল। রাজপ্রাসাদের সকলেই এই দৃশ্য দেখে আনন্দে উল্লসিত হলো। ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া পরম শ্রদ্ধায় মূসার মাতাকে ভূয়সী প্রশংসা ও উপঢৌকনে ভূষিত করলেন এবং সসম্মানে নির্দেশ দিলেন রাজকীয় খরচে নিজ গৃহে রেখে নিরাপদে শিশুকে স্তন্যপান করিয়ে বড় করতে। এভাবে পরাক্রমশালী জালিম ফেরাউনের চোখের সামনে তারই রাজকীয় অর্থে ও সুরক্ষায় আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে তাঁর গর্ভধারিণী মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিলেন। যেমনটি আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন: 'এভাবে আমি তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চক্ষু জুড়ায়, সে দুঃখ না পায় এবং যাতে সে জানতে পারে যে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না' (সূরা আল-ক্বাসাস: ১৩)।

======================================================================

বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ (KEY PRACTICAL LESSONS)

======================================================================

(1) [তাওয়াক্কুল ও ঈমান] আল্লাহর ওয়াদার ওপর নিঃশর্ত ভরসাই পরিত্রাণের মূল চাবিকাঠি

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: মূসা (আ.)-এর মাতা যখন আল্লাহর নির্দেশে নিজ দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে উত্তাল নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, তখন তাঁর একমাত্র অবলম্বন ছিল আল্লাহর প্রতিশ্রুতি। পার্থিব হিসেবে যা ছিল ধ্বংসের কারণ, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের ফলে তা-ই পরিণত হলো মুক্তির বাহনে। চরম বিপদে আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি আনুগত্যশীল থাকাই মুমিনের কর্তব্য।

(2) [ঐশী সার্বভৌমত্ব] আল্লাহর পরিকল্পনার সামনে জালিমের সমস্ত চক্রান্ত ব্যর্থ

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: ফেরাউন হাজার হাজার নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করেছিল যার ভয়ে, আল্লাহ তাকে রক্ষা করলেন এবং খোদ সেই ফেরাউনের প্রাসাদে, তার রাজকীয় ব্যয়েই লালন-পালন করালেন। এটি প্রমাণ করে মানবীয় চক্রান্ত যত বড়ই হোক, তা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরকে কখনোই প্রতিরোধ করতে পারে না।

(3) [হেকমত ও বাস্তবমুখী প্রচেষ্টা] তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি সতর্কতামূলক বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: মূসা (আ.)-এর মাতা কেবল নদীতে ভাসিয়ে দিয়েই বসে থাকেননি, বরং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য কন্যা মারইয়ামকে পাঠিয়েছিলেন। মারইয়ামও প্রাসাদে গিয়ে পরিচয় প্রকাশ না করে দূরদর্শিতার সাথে ভূমিকা রেখেছিলেন। ইসলাম অন্ধ তাওয়াক্কুল নয়, বরং বাস্তবমুখী উপায় ও বুদ্ধিমত্তা অবলম্বনের শিক্ষা দেয়।

(4) [পারিবারিক ও মাতৃত্বের সান্ত্বনা] ধৈর্য ও ত্যাগের পরম পুরস্কার আল্লাহ দুনিয়াতেই দৃশ্যমান করেন

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: মূসা (আ.)-এর মা ক্ষণিকের জন্য বিচ্ছেদ সহ্য করে ধৈর্য ধারণ করেছিলেন বলেই আল্লাহ তাঁকে দ্রুততম সময়ে শুধু সন্তানই ফিরিয়ে দেননি, বরং সার্বিক নিরাপত্তা এবং রাজকীয় মর্যাদায় সম্মানিত করেছেন। কষ্টের পরেই প্রকৃত স্বস্তি ও পুরস্কার নিহিত থাকে।

← সব ঘটনা

Scroll to Top