ইসলামিক ঘটনা

ইসলামিক ঘটনা

শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।

← সব ঘটনা

জিবরাঈল (আ.) এর আগমন: সূরা আলাকের প্রথম ওহী 'ইকরা'

সহিহ আল-বুখারীর প্রারম্ভে উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিস অনুসারে, হেরা গুহায় নির্জন আত্মনিবেদনকালে হঠাৎ এক অভূতপূর্ব ও অলৌকিক ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। সত্যের দূত জিবরাঈল (আ.) আল্লাহর নির্দেশক্রমে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে আত্মপ্রকাশ করেন। জিবরাঈল (আ.) তাঁকে লক্ষ করে উদাত্ত কণ্ঠে বললেন, 'ইকরা' অর্থাৎ 'পাঠ করুন'। রাসুলুল্লাহ ﷺ বিনীতভাবে উত্তর দিলেন, 'মা আনা বিক্বারী'—'আমি তো পাঠ করতে জানি না।'

অতঃপর জিবরাঈল (আ.) এগিয়ে এসে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে সজোরে বুকে জড়িয়ে এমনভাবে চাপ দিলেন যে, তাঁর সহ্যক্ষমতার চরম সীমায় পৌঁছে গেল। এরপর জিবরাঈল (আ.) তাঁকে ছেড়ে দিয়ে পুনরায় নির্দেশ দিলেন, 'ইকরা' (পাঠ করুন)। রাসুলুল্লাহ ﷺ দ্বিতীয়বারও একই উত্তর দিলেন, 'আমি তো পাঠকারী নই।' তখন ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) তাঁকে দ্বিতীয়বার টেনে ধরে শক্ত আলিঙ্গনে সজোরে চাপ দিয়ে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, 'ইকরা' (পাঠ করুন)। নবীজী ﷺ আবারও উত্তর দিলেন, 'আমি তো পাঠ করতে জানি না।' তখন জিবরাঈল (আ.) তৃতীয়বারের মতো তাঁকে জাপটে ধরে সজোরে চাপ দিলেন এবং ছেড়ে দিয়ে তিলাওয়াত করলেন পবিত্র কুরআনের সেই অমর প্রথম বাণী:

'ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাযী খালাক্ব। খালাকাল ইনসানা মিন 'আলাক্ব। ইকরা ওয়া রাব্বুকাল আকরাম। আল্লাযী 'আল্লামা বিল ক্বালাম। 'আল্লামাল ইনসানা মা লাম ইয়া'লাম।'

(অর্থ: পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আর আপনার প্রতিপালক পরম দয়ালু। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।)

ঐশী বাণীর এই মহাভাব ও জিবরাঈল (আ.)-এর বিস্ময়কর উপস্থিতিতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সমগ্র সত্তা কেঁপে ওঠে। তিনি ভীত ও কম্পিত হৃদয়ে দ্রুত হেরা গুহা থেকে নেমে মক্কার বাড়িতে ফিরে আসেন। গৃহে প্রবেশ করেই সহধর্মিণী খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে কম্পিত কণ্ঠে বললেন, 'যাম্মিলূনী! যাম্মিলূনী!' অর্থাৎ 'আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও! আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও!' খাদিজা (রা.) পরম মমতায় তাঁকে কম্বল ও চাদর দ্বারা আবৃত করলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর আতঙ্ক ও শারীরিক কম্পন প্রশমিত হলে তিনি খাদিজা (রা.)-কে হেরা গুহার সমস্ত ঘটনা বিস্তারিত খুলে বললেন এবং নিজের জীবনের আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, 'আমি তো নিজের প্রাণের ভয় করছি।'

তখন বুদ্ধিমতী ও ঈমানদার নারী খাদিজা (রা.) নবীজী ﷺ-কে যে কালজয়ী সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, তা বিশ্বস্ততার ইতিহাসে অনন্য। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বললেন, 'কখনোই নয়! আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনোই লাঞ্ছিত বা অপদস্থ করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, অসহায় ও দুস্থদের বোঝা নিজে বহন করেন, নিঃস্বদের উপার্জনের ব্যবস্থা করে দেন, মেহমানদের যথাযথ সমাদর করেন এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে বিপদগ্রস্তদের সর্বাত্মক সাহায্য করেন।' খাদিজা (রা.)-এর এই অবিচল বিশ্বাস রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অন্তরে স্বস্তি ও শক্তি জোগায়।

এরপর কালবিলম্ব না করে খাদিজা (রা.) নবীজী ﷺ-কে সাথে নিয়ে তাঁর পিতৃব্যপুত্র ওয়ারাকা ইবনে নাওফালের কাছে যান। ওয়ারাকা জাহিলিয়্যাতের যুগে মূর্তিপূজা বর্জন করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং হিব্রু ভাষায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করে ইনজিল কিতাব অনুবাদ করতেন। তিনি তখন বার্ধক্যের কারণে দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েছিলেন। খাদিজা (রা.) বললেন, 'হে আমার চাচাত ভাই! আপনার ভাতিজার কথা শুনুন।' ওয়ারাকা জিজ্ঞেস করলেন, 'ভাতিজা, তুমি কী দেখেছ?' রাসুলুল্লাহ ﷺ হেরা গুহার সম্পূর্ণ ঘটনা তাঁর নিকট বর্ণনা করলেন। সবকিছু শুনে প্রাজ্ঞ ওয়ারাকা কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলে উঠলেন, 'ইনি তো সেই পরম গোপনীয় বার্তা বহনকারী মহামান্বিত দূত 'নামূস' (জিবরাঈল), যাঁকে আল্লাহ মূসা (আ.)-এর নিকট প্রেরণ করেছিলেন! হায়, আমি যদি তোমার নবুওয়াত ও দাওয়াতের যুগে শক্তিশালী যুবক থাকতাম! হায়, আমি যদি সেদিন জীবিত থাকতাম যেদিন তোমার জাতি তোমাকে তোমার জন্মভূমি থেকে বহিষ্কার করবে!'

রাসুলুল্লাহ ﷺ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, 'তারা কি আমাকে সত্যিই দেশান্তরিত করবে?' ওয়ারাকা প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে বললেন, 'হ্যাঁ। তুমি যে সত্য বার্তা নিয়ে এসেছ, তা অতীতে যিনিই নিয়ে এসেছেন, তাঁর সাথেই তাঁর জাতি শত্রুতা করেছে। আমি যদি তোমার সেই কঠিন দিনে বেঁচে থাকি, তবে তোমাকে সর্বশক্তি দিয়ে পূর্ণ সমর্থন ও সাহায্য করব।' এর কিছুদিন পরই বৃদ্ধ ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন এবং কিছুদিনের জন্য ওহী অবতীর্ণ হওয়া সাময়িকভাবে স্থগিত (ফাতরাতুল ওহী) থাকে। এইভাবে হেরা গুহার নিভৃত প্রকোষ্ঠে শুরু হয় মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম নবুওয়াতী বিপ্লব।

======================================================================

বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ

======================================================================

(1) [জ্ঞানের মর্যাদা ও শিক্ষার গুরুত্ব] ইসলামের সর্বপ্রথম ঐশী নির্দেশ হলো জ্ঞানার্জন করা।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: পবিত্র কুরআনের প্রথম নির্দেশ নামাজ, রোজা বা যুদ্ধের বিধান ছিল না; বরং তা ছিল 'ইকরা' (পাঠ করো)। এই নির্দেশ প্রমাণ করে যে, আল্লাহর সঠিক পরিচয় লাভ এবং মানবতার মুক্তির মূল চাবিকাঠি হলো জ্ঞানার্জন ও কলমের মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার ঘটানো।

(2) [সৎ চরিত্রের অলৌকিক ঢাল] সৎ কর্ম এবং মানুষের সেবা বিপদাপদ থেকে রক্ষার অন্যতম মাধ্যম।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: খাদিজা (রা.) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অতীত মানবকল্যাণমূলক কাজ—যেমন আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা, দুস্থদের সাহায্য এবং মেহমানদারির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, নিঃস্বার্থ মানবসেবায় নিয়োজিত বান্দাকে আল্লাহ কখনো কোনো সংকটে অপদস্থ বা পরিত্যক্ত করেন না।

(3) [দাম্পত্য জীবনে সহমর্মিতা ও সমর্থন] সংকটের মুহূর্তে জীবনসঙ্গীর মানসিক ও আত্মিক সমর্থন অত্যন্ত অপরিহার্য।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: রাসুলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় ঘরে ফিরে খাদিজা (রা.)-এর যে অতুলনীয় মানসিক নির্ভরতা ও সান্ত্বনা পেয়েছিলেন, তা প্রতিটি মুসলিম দম্পতির জন্য অনুকরণীয়। সংকটকালে জীবনসঙ্গীর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর শক্তি বৃদ্ধি করাই আদর্শ দাম্পত্যের পরিচয়।

(4) [জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ গ্রহণ] যেকোনো বিভ্রান্তিকর বা অজানা সংকটে প্রাজ্ঞ ও নিরপেক্ষ অভিজ্ঞদের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: খাদিজা (রা.) ঐশী ঘটনার তাৎপর্য বোঝার জন্য আসমানী কিতাবের অভিজ্ঞ পণ্ডিত ওয়ারাকা ইবনে নাওফালের কাছে গিয়েছিলেন। সঠিক তথ্য ও দিকনির্দেশনার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের নির্ভরযোগ্য প্রাজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্ব এতে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

(5) [সত্যের পথে ত্যাগ ও বিরোধিতার বাস্তবতা] সত্যের দাওয়াত প্রচার করতে গেলে পার্থিব পরীক্ষা ও বৈরিতার মুখোমুখি হতে হয়।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: ওয়ারাকা নবীজী ﷺ-কে সতর্ক করেছিলেন যে, সত্যের বাণী নিয়ে আসার কারণে নিজ সম্প্রদায় তাঁকে বহিষ্কার করবে। এতে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীনের পথে চলা কখনোই মসৃণ নয়, বরং পূর্ববর্তী আম্বিয়াদের সুন্নাত অনুসারে নানাবিধ ত্যাগ ও পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।

← সব ঘটনা

Scroll to Top