ইসলামিক ঘটনা

ইসলামিক ঘটনা

শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।

← সব ঘটনা

ইব্রাহিম (আ.) এর হজের সর্বজনীন আহ্বান প্রচারের নির্দেশ

পবিত্র কাবাগৃহের প্রাচীর নির্মাণ সম্পন্ন হলে সাইয়্যিদুনা ইব্রাহিম (আ.) এবং ইসমাইল (আ.) মহান আল্লাহর দরবারে বিনীত প্রার্থনা জানালেন: 'হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের এই খিদমত কবুল করুন, নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।' পিতা-পুত্রের এই আন্তরিক ইবাদত ও কাবার পবিত্রতা নিশ্চিত করার পর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইব্রাহিম (আ.)-কে নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করলেন: 'এবং মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে এবং সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উটের পিঠে চড়ে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের গভীর গিরিপথ পাড়ি দিয়ে।' (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:২৭)।

মুফাসসির ও হাদিস বিশারদগণের প্রামাণ্য বর্ণনা অনুযায়ী, মহান আল্লাহর এই নির্দেশ প্রাপ্তির পর আল্লাহর খলিল ইব্রাহিম (আ.) বিনম্রভাবে নিবেদন করলেন, 'হে আমার প্রতিপালক! এই জনমানবহীন প্রান্তরে আমার কণ্ঠ কতটুকুই বা পৌঁছাবে? চারিদিকে সুবিশাল পর্বত আর ধূ-ধূ মরুভূমি, এখানে তো কোনো জনমানুষের কোলাহল নেই। আমার আওয়াজ কীভাবে সারা বিশ্বের মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছাবে?' আল্লাহ রব্বুল আলামিন সান্ত্বনা ও চূড়ান্ত কুদরতের আশ্বাস দিয়ে ওহির মাধ্যমে জানালেন, 'হে ইব্রাহিম! তোমার দায়িত্ব কেবল আহ্বান জানানো, আর সৃষ্টির কর্ণকুহরে তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণ আমার।' বান্দার কর্তব্য কেবল আল্লাহর আদেশের অনুবর্তী হওয়া এবং সাধ্য অনুযায়ী আমল করা; ফলাফলের মালিক একমাত্র আল্লাহ।

প্রতিপালকের এই বাণী শ্রবণ করার পর ইব্রাহিম (আ.) কোনো দ্বিধা বা বিলম্ব না করে আল্লাহর আদেশের বাস্তবায়নে প্রস্তুত হলেন। প্রখ্যাত তাবেয়ী ও মুফাসসির মুজাহিদ, ইকরামা এবং ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েত অনুযায়ী, তিনি মাকামে ইব্রাহিম অথবা নিকটবর্তী জাবালে আবু কুবাইস (মতান্তরে জাবালে সাফা)-এর ওপর দণ্ডায়মান হলেন। তিনি তাঁর দুই কানে আঙুল রেখে পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ—চতুর্দিকে মুখ ফিরিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন: 'হে মানবজাতি! নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক তাঁর নিজের জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করেছেন এবং তোমাদের ওপর এই গৃহের হজ ফরজ করেছেন। অতএব, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের আহ্বানে সাড়া দাও এবং তাঁর গৃহের হজ পালন করো!'

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর অনন্ত কুদরত ও মহিমায় সেই আহ্বানকে সমস্ত বাধা অতিক্রম করিয়ে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিলেন। বাতাস, পাহাড়-পর্বত এবং বৃক্ষরাজি সেই আহ্বানের বাহক হয়ে উঠল। প্রামাণ্য তাফসির গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, মহান আল্লাহ সেই মুহূর্তে কেবল সমকালীন জীবিত মানুষদের নয়, বরং আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত রূহ আগমন করবে, তাদের প্রত্যেকের কর্ণে ও অন্তরে এই পবিত্র বাণী পৌঁছে দিয়েছিলেন। আর যে আত্মাই সেদিন আল্লাহর বিধানে হজের তাওফিক পাওয়ার অধিকারী ছিল, সে তার অন্তরের অন্তস্তল থেকে জবাব দিয়েছিল: 'লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক' (আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির)।

তফসিরে ইবনে কাসীরে প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সেদিন যার ভাগ্যে আল্লাহ হজ নসিব করেছিলেন, সে একবার কিংবা ততোধিকবার 'লাব্বাইক' বলে সাড়া দিয়েছিল। যে ব্যক্তি যতবার সাড়া দিয়েছিল, তার তকদিরে ততবার হজ সম্পাদনের সুযোগ নির্ধারিত হয়ে যায়। ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই একাকী কণ্ঠস্বর আজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিমের হৃদয়ে স্পন্দিত হচ্ছে। কোনো জাগতিক প্রচারমাধ্যম ছাড়াই স্রেফ আল্লাহর কুদরতি ঘোষণায় আজ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ধনী-গরিব, সাদা-কালো ভেদাভেদ ভুলে উম্মতে মুহাম্মাদী শ্বেতশুভ্র ইহরাম পরিধান করে পদব্রজে ও দূরপাল্লার বাহনে চড়ে মক্কার পানে ছুটে চলেছে। এটি ছিল আল্লাহর প্রতি একজন নবীর নিখাদ তাওয়াক্কুল এবং প্রতিশ্রুতির এক জীবন্ত মুজিজা।

======================================================================

বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ (KEY PRACTICAL LESSONS)

======================================================================

(1) [ঈমান ও তাওয়াক্কুল] ফলাফলের ওপর নয়, বরং আদেশের আনুগত্যে মনোনিবেশ করা মুমিনের মূল দায়িত্ব।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: ইব্রাহিম (আ.) নিজের সীমাবদ্ধতার কথা জানতেন, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশের সামনে কোনো যুক্তি পেশ না করে পূর্ণ আস্থা রেখেছেন। মানুষ সাধ্যমতো চেষ্টা করবে, কিন্তু কার্যসিদ্ধি ও মানুষের হৃদয় জয় করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে।

(2) [তাওহীদ ও ইবাদত] হজ কোনো আঞ্চলিক উৎসব নয়, এটি তাওহীদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এক বিশ্বজনীন ইবাদত।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: হজের আহ্বানের মূল লক্ষ্য ছিল সকল প্রকার শিরক থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়া। ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করে একই পোশাকে একই রবের দরবারে হাজির হওয়া তাওহীদের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

(3) [আল্লাহর কুদরত ও ওহির সত্যতা] আল্লাহর প্রতিটি প্রতিশ্রুতি সত্য এবং তাঁর ক্ষমতার কোনো সীমা নেই।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: হাজার বছর আগে এক বিজন মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে করা একটি সাধারণ ঘোষণা আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে বায়তুল্লাহর প্রেমে ব্যাকুল করে রাখে, যা সরাসরি আল্লাহর কুদরত এবং কুরআনিক বাণীর সত্যতার চাক্ষুষ প্রমাণ।

(4) [দাওয়াত ও প্রচার পদ্ধতি] হক কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাহ্যিক উপায়-উপকরণের অপ্রতুলতা কখনো বাধা হতে পারে না।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: সত্যের দাঈদের উচিত নিষ্ঠা ও ইখলাসের সাথে বাণী প্রচার করা। শ্রোতা কম বা অনুকূল পরিবেশ নেই—এই অজুহাতে সত্যের প্রচার বন্ধ রাখা যাবে না; প্রচারক প্রচার করবেন, আল্লাহ তা মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেবেন।

← সব ঘটনা

Scroll to Top