ইসলামিক ঘটনা

ইসলামিক ঘটনা

শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।

← সব ঘটনা

পিতা-পুত্রের যৌথ শ্রমে পবিত্র কাবা ঘরের পুনঃনির্মাণ ও দোয়া

সহিহ আল-বুখারীর কিতাবুল আম্বিয়ায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদিস অনুসারে, ইসমাইল (আ.) যখন যৌবনে পদার্পণ করেন এবং জুরহুম গোত্রে বিবাহ করেন, তখন একদিন হযরত ইব্রাহিম (আ.) মক্কায় আগমন করলেন। তিনি ইসমাইল (আ.)-কে জমজম কূপের নিকটবর্তী একটি বাবলা গাছের নিচে বসে তীর মেরামত করতে দেখলেন। পিতাকে দেখামাত্রই ইসমাইল (আ.) দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা ও স্নেহে তাঁকে আলিঙ্গন করলেন; পিতা ও পুত্রের মিলনে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হলো। কুশল বিনিময়ের পর হযরত ইব্রাহিম (আ.) বললেন, 'হে ইসমাইল! আল্লাহ আমাকে একটি গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছেন।' ইসমাইল (আ.) নির্দ্বিধায় উত্তর দিলেন, 'আপনার রব আপনাকে যা নির্দেশ করেছেন, আপনি তা সম্পাদন করুন।' ইব্রাহিম (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি আমাকে এ কাজে সাহায্য করবে?' ইসমাইল (আ.) দ্বিধাহীন চিত্তে বললেন, 'হ্যাঁ, আমি অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করব।' তখন ইব্রাহিম (আ.) একটি অপেক্ষাকৃত উঁচু টিলার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, 'আল্লাহ আমাকে এখানে একটি ঘর নির্মাণের আদেশ দিয়েছেন।'

অতঃপর পিতা ও পুত্র কালবিলম্ব না করে পবিত্র গৃহের ভিত্তি উত্তোলনের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। কাবা ঘরের প্রাচীন ভিত্তির সন্ধান লাভ করার পর তাঁরা দেয়াল গাঁথতে শুরু করলেন। যুবক পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) পাহাড় ও উপত্যকা থেকে ভারী ভারী পাথর বয়ে নিয়ে আসতেন, আর বৃদ্ধ পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ পবিত্র হাতে সেই পাথরগুলো নিখুঁতভাবে গেঁথে দেওয়াল তুলছিলেন। রক্ত-ঘামে ভেজা এই পরিশ্রমে কোনো ক্লান্তি বা অভিযোগ ছিল না। যখন দেওয়ালগুলো মানুষের উচ্চতা অতিক্রম করে আরও উঁচুতে উঠে গেল এবং ইব্রাহিম (আ.)-এর পক্ষে নিচ থেকে পাথর গাঁথা আর সম্ভব হচ্ছিল না, তখন ইসমাইল (আ.) একটি বিশেষ পাথর বহন করে আনলেন। ইব্রাহিম (আ.) সেই পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে দেওয়াল নির্মাণের কাজ অব্যাহত রাখলেন, আর ইসমাইল (আ.) নিচ থেকে পাথর তুলে দিতে লাগলেন। এই পাথরটিই পরবর্তীতে 'মাকামে ইব্রাহিম' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, যার ওপর দাঁড়িয়ে খলিলুল্লাহর কাজ করার সময় অলৌকিকভাবে তাঁর পদচিহ্ন মুদ্রিত হয়ে গিয়েছিল।

পবিত্র কাবার দেওয়াল চারপাশ থেকে যত উঁচু হচ্ছিল, পিতা-পুত্রের তাওয়াক্কুল ও বিনয় তত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তাঁরা পাথরের পর পাথর স্থাপন করতেন এবং উভয়ে সমস্বরে আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত বিনীত কণ্ঠে ফরিয়াদ করতেন, যা পবিত্র কুরআনে সূরা আল-বাকারার ১২৭ নং আয়াতে চিরস্মরণীয় করে রাখা হয়েছে: 'রাব্বানা তাকাব্বাল মিন্না, ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম'—অর্থাৎ 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাত।' তাঁরা কোনো পারিশ্রমিক বা দুনিয়াবি খ্যাতির প্রত্যাশা করেননি; বরং শ্রেষ্ঠতম একটি আমল সম্পাদনের সময়ও নিজেদের ত্রুটি-বিচ্যুতির ভয়ে কেবল রবের সন্তুষ্টি ও কবুলিয়াতের আকুতি জানিয়েছিলেন।

নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে পিতা-পুত্র কেবল অতীতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশেই ক্ষান্ত হননি, বরং ভবিষ্যৎ মানবজাতির হিদায়েতের জন্য সুদূরপ্রসারী প্রার্থনা করেছিলেন। তাঁরা দোয়া করলেন, 'হে আমাদের রব! আমাদের উভয়কে আপনার প্রতি অনুগত (মুসলিম) করুন এবং আমাদের বংশধর থেকেও আপনার এক অনুগত জাতি সৃষ্টি করুন। আমাদের হজের নিয়ম-পদ্ধতি শিখিয়ে দিন এবং আমাদের তওবা কবুল করুন।' অতঃপর তাঁরা মানবজাতির মুক্তির মহান দিশারী প্রেরণের দোয়া করে বললেন, 'হে আমাদের প্রতিপালক! তাঁদের মধ্য থেকেই তাঁদের কাছে একজন রাসুল প্রেরণ করুন, যিনি তাঁদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাঁদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাঁদের পরিশুদ্ধ করবেন' (সূরা আল-বাকারা: ১২৮-১২৯)। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁদের এই প্রার্থনা পূর্ণ করেছিলেন শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রেরণের মাধ্যমে, যিনি নিজেই ইরশাদ করেছিলেন, 'আমি আমার পিতা ইব্রাহিমের দোয়ার ফসল।' ঘর নির্মাণ সমাপ্ত হলে জিব্রাইল (আ.) এসে তাঁদের হজের আহকাম ও তাওয়াফের নিয়ম শিক্ষা দেন এবং আল্লাহর আদেশে ইব্রাহিম (আ.) মাকামে ইব্রাহিম অথবা আবু কুবাইস পাহাড়ে দাঁড়িয়ে সমগ্র মানবজাতির প্রতি হজের আহ্বান জানান।

======================================================================

বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ

======================================================================

(1) [আমল কবুলিয়াত ও বিনম্রতা] নেক আমল যত মহৎই হোক না কেন, অহংকার বর্জন করে তা কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে রোনাজারি করা আবশ্যক।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: হযরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.) আল্লাহর ঘর নির্মাণের মতো মহান কাজ করেও গর্ববোধ করেননি; বরং আমলটি কবুল হওয়া নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন এবং বিনম্রভাবে দোয়ায় লিপ্ত ছিলেন।

(2) [পারিবারিক সহযোগিতা ও পিতা-পুত্রের সম্পর্ক] দ্বীনি ও কল্যাণকর কাজে পরিবারের সদস্যদের যৌথ অংশগ্রহণ পারিবারিক বন্ধন এবং আল্লাহর রহমত বৃদ্ধি করে।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: বৃদ্ধ পিতা ও তরুণ পুত্রের যৌথ শারীরিক শ্রম প্রমাণ করে যে, দ্বীনের খিদমতে পরিবারের প্রতিটি প্রজন্মের অংশগ্রহণ একটি আদর্শ মুসলিম পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য।

(3) [দূরদর্শী দোয়া ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ফিকির] দোয়ায় কেবল নিজের স্বার্থ নয়, ভবিষ্যৎ বংশধর ও উম্মাহর হিদায়েত এবং কল্যাণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: হযরত ইব্রাহিম (আ.) কয়েক হাজার বছর পরের বংশধরদের ঈমান ও শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের জন্য ব্যাকুল হয়ে দোয়া করেছিলেন, যা দোয়া কবুলের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত।

(4) [তাওহীদের কেন্দ্রবিন্দুর প্রতি মর্যাদা] পবিত্র কাবা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট নিদর্শনসমূহের (যেমন মাকামে ইব্রাহিম ও জমজম) যথাযথ সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অংশ।

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: কাবা ঘর আল্লাহর তাওহীদের প্রকাশ্য প্রতীক। এর নির্মাণ ইতিহাস জানা এবং এর পবিত্রতা অন্তরে ধারণ করা মুমিনের তাকওয়াকে সুদৃঢ় করে।

← সব ঘটনা

Scroll to Top