ইসলামিক ঘটনা
শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন্ত মোজেজা: পবিত্র কুরআনুল কারীমের চিরন্তন অবিকৃত রূপ
সহিহ আল-বুখারীতে আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি অতীব তাৎপর্যপূর্ণ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: 'এমন কোনো নবী প্রেরিত হননি যাঁকে এমন কোনো নিদর্শন বা অলৌকিক ক্ষমতা দেওয়া হয়নি যার ওপর মানবজাতি ঈমান এনেছিল। আর আমাকে যা দেওয়া হয়েছে তা হলো এমন এক ওহি (কুরআন), যা আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। অতএব আমি আশা করি যে, কিয়ামতের দিন সকল নবীর চেয়ে আমার অনুসারীর সংখ্যাই সর্বাধিক হবে।' (সহিহ বুখারী: ৪৯৮১)।
এই বাণীর মর্মার্থ উপলব্ধি করা যায় কুরআনের অবতরণ ও সংরক্ষণের ইতিহাসের প্রতিটি ধাপে। কুরআন যখন অবতীর্ণ হতে থাকে, তখন আরবের শ্রেষ্ঠ কবি ও বাগ্মীরা একে কোনো সাধারণ মানবীয় রচনা হিসেবে প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরাহ—যিনি কুরাইশদের মধ্যে আরবি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিলেন—পবিত্র কুরআনের কিছু আয়াত রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মুখে শুনে হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন: 'আল্লাহর শপথ! তার কথায় এমন এক মিষ্টতা রয়েছে এবং তাতে রয়েছে এমন এক লাবণ্য ও সৌন্দর্য, যার ওপরের অংশ ফলবতী এবং নিচের অংশ সুজলা-সুফলা। তা সর্ববিজয়ী এবং তার ওপর বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়; এটি কোনো মানুষের বাণী হতে পারে না।' আল-বায়হাকীর 'দালাইলুন নবুওয়াত'-এ এই ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বিশুদ্ধ সনদে সংরক্ষিত আছে।
কুরআনুল কারীম ধাপে ধাপে মানবজাতিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়: প্রথমে পুরো কুরআনের মতো একটি গ্রন্থ রচনার (সুরা বনি ইসরাঈল: ৮৮), অতঃপর দশটি সুরার (সুরা হুদ: ১৩), এবং সর্বশেষে কুরআনের মতো ক্ষুদ্রতম একটি সুরা রচনার (সুরা আল-বাকারা: ২৩)। সেই যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীর কেউই এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কুরআনের সমকক্ষ একক কোনো বাক্য বা সুরা রচনা করতে সক্ষম হয়নি।
কুরআনের এই মোজেজার দ্বিতীয় বিস্ময়কর দিক হলো এর ঐতিহাসিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা। আল্লাহ তাআলা সুরা আল-হিজরের ৯ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেন: 'নিশ্চয় আমিই এই স্মরণিকা (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং নিশ্চয় আমি নিজেই এর পরম সংরক্ষক।' রাসুলুল্লাহ ﷺ যখনই কোনো ওহি প্রাপ্ত হতেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি কাতিবিনে ওহি বা ওহি লেখকদের ডেকে তা লিখিয়ে নিতেন। যায়েদ ইবনে সাবিত, উবাই ইবনে কা'ব, আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) প্রমুখ সাহাবিগণ তা লিখে রাখতেন। একই সাথে শত শত সাহাবি প্রতিটি আয়াত মুখস্থ (হিফজ) করে নিতেন এবং দৈনিক সালাতে তা তিলাওয়াত করতেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর ইয়ামামার যুদ্ধে বহু সংখ্যক হাফেজে কুরআন সাহাবি শাহাদাত বরণ করলে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কুরআন গ্রন্থাকারে একত্রিত করার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করেন। তিনি খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর নিকট বিষয়টি উপস্থাপন করেন। আবু বকর (রা.) প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও নিরপেক্ষ যুবক যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে এই কাজের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। যায়েদ (রা.) কোনো আয়াত কেবল স্মৃতি বা লিখিত নথির ওপর নির্ভর করে গ্রহণ করেননি; বরং কঠোর বৈজ্ঞানিক ও মুহাদ্দিসসুলভ নীতির মাধ্যমে অন্তত দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর উপস্থিতিতে লিখিত নথির সাথে সাহাবিদের সিনার হিফজ মিলিয়ে চরম সতর্কতার সাথে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুসহাফ তৈরি করেন (সহিহ বুখারী: ৪৯৮৬)।
পরবর্তীতে উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে যখন মুসলিম সাম্রাজ্য পারস্য ও রোমের বহু দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তখন নতুন অনারব মুসলিমদের মাঝে কিরাত বা তিলাওয়াত পদ্ধতিতে বিভ্রান্তির আশঙ্কা দেখা দেয়। হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.)-এর সতর্কবার্তায় উসমান (রা.) আবু বকর (রা.)-এর নিকট সংরক্ষিত মূল পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে কোরআনের কেন্দ্রীয় অনুলিপি তৈরির নির্দেশ দেন। যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে চারজন শীর্ষস্থানীয় সাহাবি দ্বারা বিশুদ্ধ কুরাইশ রীতি অনুসারে একাধিক অনুলিপি প্রস্তুত করে প্রধান প্রধান ইসলামি প্রদেশসমূহে পাঠানো হয় এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত বা অপূর্ণাঙ্গ নোটসমূহ পুড়িয়ে ফেলার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় (সহিহ বুখারী: ৪৯৮৭)। এই সুদৃঢ় ব্যবস্থাপনার ফলে কিয়ামত পর্যন্ত কুরআনের প্রতিটি হরফ, নুকতা ও হরকত বিকৃতির হাত থেকে সুরক্ষিত হয়ে যায়, যা পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থের ক্ষেত্রে কখনো ঘটেনি।
======================================================================
বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ
======================================================================
(1) [আকিদা ও ঈমান] কুরআন মানব রচিত নয়, বরং স্বয়ং স্রষ্টার চিরন্তন ও অলৌকিক বাণী।
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: পূর্ববর্তী নবীদের মোজেজা কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও পবিত্র কুরআন আজও দৃশ্যমান ও পঠিত হচ্ছে। এর প্রতিটি শব্দ যে অপরিবর্তিত রয়েছে, তা প্রতিটি মুমিনের ঈমানকে অটল ও সুদৃঢ় করে।
(2) [হিফজ ও সংরক্ষণ পদ্ধতি] ঐশী গ্রন্থ সংরক্ষণে লিখিত রূপের পাশাপাশি হৃদয়ে ধারণের (হিফজ) অনন্য ঐতিহ্য।
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: বিশ্বের কোনো গ্রন্থ লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ে আদ্যোপান্ত অবিকল মুখস্থ থাকে না। কুরআনের হাফেজগণের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা এই মোজেজাকে দৃশ্যমানভাবে সংরক্ষণ করে চলেছেন।
(3) [উম্মাহর ঐক্য রক্ষা] বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা রোধে সাহাবিদের মতো প্রজ্ঞাপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণ।
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: উসমান (রা.) কর্তৃক প্রমিত মুসহাফের সর্বজনীন রূপ প্রতিষ্ঠা মুসলিম উম্মাহকে মহা ফিতনা ও আকিদাগত বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করেছিল। উম্মাহর ঐক্যের স্বার্থে প্রামাণ্য ভিত্তির ওপর একতাবদ্ধ হওয়া আবশ্যক।
(4) [তাদাব্বুর ও আমল] কেবল পাঠ ও মুখস্থেই সীমাবদ্ধ না থেকে কুরআনের বিধান জীবনে বাস্তবায়ন।
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: কুরআন কেবল পড়ার অলৌকিক গ্রন্থ নয়; বরং মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ ঐশী সংবিধান। এর নির্দেশাবলি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাই কুরআনকে সম্মান প্রদর্শনের প্রকৃত উপায়।
