ইসলামিক ঘটনা
শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) কর্তৃক বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.) এর মুক্তি ও তপ্ত পাথরে "আহাদ! আহাদ!" ধ্বনি
হাবশার (ইথিওপিয়া) এক কৃষ্ণাঙ্গ দাস ছিলেন বিলাল ইবন রাবাহ। তিনি ছিলেন কুরাইশদের শীর্ষ ধনাঢ্য নেতা এবং চরম ইসলামবিদ্বেষী উমাইয়া ইবন খালাফের ক্রীতদাস।
মক্কার প্রত্যন্ত কোণে যখন তাওহীদের নূর প্রস্ফুটিত হলো, তখন বিলাল (রা.) এর পবিত্র অন্তরে ইসলামের সত্যতা আলো জ্বালল। তিনি গোপনে বিশ্বনবী মুহাম্মদ ﷺ এর কাছে উপস্থিত হয়ে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করলেন।
কিন্তু এই খবর চাপা থাকল না। উমাইয়া ইবন খালাফ যখন জানতে পারল তার নিজস্ব দাস বিলাল তাদের পূর্বপুরুষদের মূর্তি লাত ও উজ্জাকে বর্জন করে এক আল্লাহর দ্বীন গ্রহণ করেছে, তখন তার অহংকারে প্রচণ্ড আঘাত লাগল। সে বিলালকে ইসলাম ত্যাগে বাধ্য করার জন্য মক্কার ইতিহাসের বর্বরতম নির্যাতনের ছক আঁকল।
গ্রীষ্মের দ্বিপ্রহরে মক্কার মরুভূমির পাথরগুলো যখন উত্তপ্ত কড়াইয়ের মতো ফুটত, তখন উমাইয়া বিলালকে লৌহবর্ম পরিয়ে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখত। এরপর সে বিলালের গলায় শক্ত চামড়ার রশি বেঁধে মক্কার দুষ্ট ও বেপরোয়া ছেলেদের হাতে তুলে দিত। তারা বিলালকে মক্কার পাথুরে গিরিপথ দিয়ে চাবুক মারতে মারতে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে বেড়াত। বিলালের শরীরের চামড়া উঠে রক্তে মরুভূমির ধূলি লাল হয়ে যেত।
কিন্তু এতেও যখন বিলালের অন্তরকে টলানো গেল না, তখন উমাইয়া তাঁকে উলঙ্গ করে দুপুরের জ্বলন্ত পাথুরে বালুর ওপর পিঠ ঠেকিয়ে শুইয়ে দিত। এরপর কয়েকজন বলিষ্ঠ ব্যক্তি মিলে একটি বিশালাকার ভারী পাথর তুলে বিলালের বুকের ওপর সজোরে চেপে বসিয়ে দিত, যাতে তিনি সামান্য নড়াচড়াও করতে না পারেন। বাতাসের অভাবে বিলালের চোখ দুটি কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হতো এবং তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসত।
উমাইয়া দাঁত কিড়মিড় করে চিৎকার করে বলত:
"লাক্বাদ তামূতু আও তাকফুরা বি-মুহাম্মাদ, ওয়া তা'বুদাল লাতা ওয়াল উজ্জা!"
(আল্লাহর শপথ! তুই এভাবে মরবি, নয়তো মুহাম্মদকে অস্বীকার করে পুনরায় লাত ও উজ্জার পূজা করবি!)
মৃত্যুর মুখমণ্ডলে দাঁড়িয়েও বিলালের ঈমানী প্রত্যয় ছিল হিমালয়ের চেয়েও অটল। তিনি দুর্বল, রুদ্ধশ্বাসে কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করতেন:
"আহাদ! আহাদ!" (এক আল্লাহ! এক আল্লাহ!)
"আল্লাহর শপথ! আমি যদি তোমাদের কোনো কথা জানতাম যা তোমাদের আরও বেশি রাগিয়ে দেবে, তবে আমি সেই কথাই উচ্চারণ করতাম!"
ওয়ারাক্বা ইবনে নাওফাল এই করুণ দৃশ্য দেখে চোখে পানি ফেলে বলেছিলেন: "হে বিলাল! আহাদ! আহাদ! আল্লাহর শপথ, তুমি যদি এই অবস্থায় মারা যাও, তবে আমি তোমার কবরকে বরকতময় স্থান বানিয়ে নেব।"
একদিন উমাইয়া যখন পাথর চাপা দিয়ে বিলালের ওপর চাবুক চালাচ্ছিল, তখন সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন সিদ্দিকে আকবর হযরত আবু বকর (রা.)।
তিনি এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে ক্ষোভে ও দুঃখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি উমাইয়াকে লক্ষ্য করে বললেন:
"আলা তাত্তাক্বিল্লাহ ফী হাযাল মিসকীন? হাত্তা মাতা?"
(তুমি কি এই অসহায় মানুষটির ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো না? আর কতদিন তার ওপর এই নির্মম নির্যাতন চালাবে?)
উমাইয়া তাচ্ছিল্যভরে বলল: "তুমিই তো তাকে বিগড়ে দিয়েছ! এতই যদি তোমার মায়া হয়, তবে তাকে আমার কাছ থেকে কিনে নাও!"
আবু বকর (রা.) এক মুহূর্তও চিন্তা না করে বললেন: "বলো, কত মূল্য চাও তুমি?"
উমাইয়া ভেবেছিল আবু বকরকে ফাঁদে ফেলবে। সে সাধারণ মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি—সাতটি খাঁটি ও ভারী স্বর্ণমুদ্রা (উমিয়া) দাবি করল।
আবু বকর (রা.) তৎক্ষণাৎ সেই বিপুল স্বর্ণমুদ্রা উমাইয়ার মুখের সামনে ছুড়ে দিলেন এবং বললেন: "আমি বিলালকে ক্রয় করে নিলাম!"
উমাইয়া উপহাস করে বলল: "আবু বকর! তুমি যদি এক স্বর্ণমুদ্রাও দিতে, তবে আমি এই হাবশী দাসকে তোমার কাছে বিক্রি করে দিতাম!"
তখন আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বজ্রকণ্ঠে বললেন:
"আল্লাহর শপথ! তুমি যদি একশত স্বর্ণমুদ্রাও দাবি করতে, তবে আল্লাহর এই মহান বান্দাকে মুক্ত করতে আমি আমার শেষ সম্বলটুকু দিয়ে হলেও তাকে ক্রয় করতাম!"
আবু বকর (রা.) পরম মমতায় বিলালের বুকের ওপর থেকে সেই ভারী পাথরটি সরিয়ে দিলেন। নিজের চাদর দিয়ে তাঁর রক্তাক্ত শরীর মুছে দিলেন এবং দুই হাত দিয়ে তাঁকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরে সমবেত জনতার সামনে ঐতিহাসিক ঘোষণা দিলেন:
"হাযা হুররুন লি-ওয়াজহিল্লাহ!"
(আজ থেকে এই বিলাল একমাত্র পরাক্রমশালী আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে চিরতরে স্বাধীন ও মুক্ত!)
পরবর্তীতে এই বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.) মদিনা মুনাওয়ারার মসজিদে নববীতে ইসলামের প্রথম মুয়াযযিন হিসেবে নিযুক্ত হন এবং মক্কা বিজয়ের দিন কাবার ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে তাওহীদের আযান ধ্বনিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) যখনই বিলালের নাম স্মরণ করতেন, তখন অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে বলতেন:
"আবু বাকরিন সাইয়্যিদুনা, ওয়া আ'তাক্বা সাইয়্যিদানা!"
(আবু বকর আমাদের পরম নেতা, আর তিনি আমাদের আরেক মহান নেতা বিলালকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছেন!)
======================================================================
বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ (KEY PRACTICAL LESSONS)
======================================================================
(1) [তাওহীদের পরাকাষ্ঠা] চরম নিপীড়নের মুখেও একত্ববাদে অটল থাকা
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: বিলাল (রা.) দেখিয়েছেন শরীরের হাড়গোড় চূর্ণ হলেও মুমিনের জিহ্বা ও অন্তর আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষণা থেকে বিচ্যুত হয় না।
(2) [বর্ণবাদ বিলোপ ও মর্যাদা] ইসলামে চামড়ার রঙ নয়, তাকওয়াই শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: কুরাইশ নেতাদের চরম অহংকার ধূলিসাৎ করে একজন কৃষ্ণাঙ্গ হাবশী দাসকে ইসলাম উম্মাহর শ্রদ্ধাভাজন নেতৃত্বে অভিষিক্ত করেছে।
