ইসলামিক ঘটনা
শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।
সালমান ফারসী (রা.) এর সত্যের সন্ধানে ঐতিহাসিক সফর: পারস্যের অগ্নিকুণ্ড থেকে বিশ্বনবীর পবিত্র পদপ্রান্তে
পারস্যের বিখ্যাত জয়ী (বর্তমান ইস্পাহান) অঞ্চলের এক ধনী ও প্রভাবশালী ভূস্বামী পিতার আদরের সন্তান ছিলেন সালমান (ইসলাম-পূর্ব নাম রুযবাহ)। তাঁর পিতা অগ্নিমন্দিরের প্রধান ছিলেন এবং আগুনের শিখা যাতে এক মুহূর্তের জন্যও না নিভে যায়, সেই দায়িত্ব তরুণ সালমানের ওপর ন্যস্ত করেছিলেন।
একদিন পিতা তাঁকে পারিবারিক বাগান তদারকির জন্য পাঠালেন। পথিমধ্যে তিনি এক নির্জন খ্রিস্টান চার্চের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখান থেকে আসা সুমধুর প্রার্থনার সুর তাঁর হৃদয়কে নাড়া দিল। তিনি ভেতরে গিয়ে দেখলেন তারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করছে। সালমান মনে মনে ভাবলেন: "আল্লাহর কসম! আমাদের এই আগুন পূজার চেয়ে এদের দ্বীন অনেক বেশি পবিত্র ও সত্য!"
তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে কাটিয়ে দিলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন: "এই ধর্মের মূল কেন্দ্র কোথায়?" তারা বলল: "শাম (সিরিয়া) দেশে।"
বাড়ি ফিরতেই পিতা ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে ভারী শিকল দিয়ে ঘরের ভেতর বন্দি করে রাখলেন। কিন্তু সালমান এক কাফেলার সাথে যোগাযোগ করে শিকল ভেঙে সিরিয়ার উদ্দেশে পালিয়ে গেলেন।
সিরিয়ায় পৌঁছে তিনি প্রধান বিশপের সেবায় নিজেকে সঁপে দিলেন। কিন্তু সেই বিশপ ছিল লোভী; সে মানুষের সদকার সোনা-রূপা নিজের সিন্দুকে জমাত। তার মৃত্যুর পর এক খাঁটি দরবেশ বিশপ আসলেন, যিনি ছিলেন দুনিয়াত্যাগী ও খাঁটি তাওহীদের অনুসারী। সালমান পরম ভক্তিতে তাঁর সেবা করতে লাগলেন।
মৃত্যুকালে সালমান কাঁদলেন: "আপনার পর আমাকে কার কাছে নসীহত করে যাবেন?"
তিনি মসুলের এক দরবেশ সন্ন্যাসীর ঠিকানা দিলেন।
সালমান মসুলে গেলেন। তাঁর মৃত্যুর পর নসিবিনের এক পাদ্রীর কাছে গেলেন। পরিশেষে রোম সাম্রাজ্যের আম্মুরিয়ার এক পরহেযগার সাধকের সান্নিধ্যে বহু বছর অতিবাহিত করলেন। সেখানে সালমান নিজের পরিশ্রমে কয়েকটি গরু ও ছাগল উপার্জন করলেন।
অবশেষে আম্মুরিয়ার সেই সাধকেরও মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলো। সালমান অশ্রুভেজা কণ্ঠে বললেন: "হে শ্রদ্ধেয় শিক্ষক! এখন আমি কার আশ্রয়ে যাব?"
বৃদ্ধ সাধক বললেন:
"হে বৎস! আল্লাহর কসম, আজ এই পৃথিবীর বুকে আসল দ্বীনের ওপর অবিচল আর কোনো মানুষকে আমি চিনি না! কিন্তু তোমার জন্য এক পরম সুসংবাদ! এক মহান নবীর আবির্ভাবের সময় সমাগত হয়েছে, যিনি ইব্রাহিম (আ.) এর খাঁটি দ্বীন নিয়ে আরব ভূমিতে খেজুরগাছে ঘেরা দুই পাথুরে পাহাড়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলে হিজরত করবেন। তাঁর মধ্যে তিনটি অভ্রান্ত গোপন আলামত থাকবে:
১. তিনি সদকার কোনো মাল নিজে ভক্ষণ করবেন না;
২. তিনি উপহার (হাদিয়া) গ্রহণ করবেন ও তা খাবেন;
৩. তাঁর দুই কাঁধের মাঝামাঝি স্থানে মোহরে নবুওয়তের সুস্পষ্ট মোহর অঙ্কিত থাকবে!
তুমি পারলে সেই দেশে চলে যাও!"
শিক্ষকের দাফন শেষে সালমান আরবের বনু কালব গোত্রের এক বণিক কাফেলাকে নিজের সমস্ত গরু ও ছাগল দিয়ে বললেন: "আমাকে আরব দেশে নিয়ে চলো।"
কিন্তু আরবের "ওয়াদিউল কুরা" নামক স্থানে পৌঁছামাত্র সেই বণিকরা বিশ্বাসঘাতকতা করল। তারা সালমানকে এক ইহুদির কাছে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দিল!
কিছুদিন পর মদিনার বনু কুরাইজা গোত্রের এক ইহুদি তাঁকে কিনে মদিনায় নিয়ে আসলো।
মদিনায় প্রবেশ করেই বিস্তীর্ণ খেজুরের বাগান দেখে সালমানের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল—তিনি বুঝলেন, এটাই সেই প্রতিশ্রুত নগরী! কিন্তু তিনি ছিলেন দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ; ফলে তিনি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না।
বহু বছর কেটে গেল।
একদিন সালমান খেজুর গাছের চূড়ায় উঠে কাজ করছিলেন, আর নিচে তাঁর ইহুদি মনিব বসে ছিল। এমন সময় মনিবের চাচাতো ভাই এসে বলল: "আল্লাহ বনু ক্বায়লাকে ধ্বংস করুক! তারা মক্কা থেকে আগত এক ব্যক্তিকে কুবা নামক স্থানে অভ্যর্থনা জানাতে ভিড় করেছে, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবি করছেন!"
একথা শোনা মাত্রই সালমানের সারা শরীর কাঁপতে লাগল। তিনি এমনভাবে কাঁপছিলেন যে গাছ থেকে মনিবের গায়ের ওপর পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলেন!
তিনি দ্রুত গাছ থেকে নেমে এসে ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন: "কী বললে তুমি? আবার বলো!"
মনিব ক্রুদ্ধ হয়ে সালমানের মুখে এক চড় মেরে বলল: "তোর এতে কী দরকার? কাজে যা!"
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। সালমান নিজের জমানো কিছু সুস্বাদু খেজুর একটি পাত্রে নিয়ে কুবায় উপস্থিত হলেন।
তিনি বিশ্বনবী মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সামনে পাত্রটি রেখে বললেন: "আমি শুনেছি আপনি এক সৎ মানুষ এবং আপনার সাথে নিঃস্ব সঙ্গীরা রয়েছে। এটা সদকা হিসেবে আনা কিছু খাবার।"
রাসুল ﷺ তাঁর সঙ্গীদের বললেন: "তোমরা খাও।" কিন্তু তিনি নিজে একটি খেজুরও মুখে দিলেন না!
সালমান মনে মনে বললেন: "এটি প্রথম নিদর্শন!"
পরের দিন রাসুল ﷺ যখন মদিনায় আসলেন, সালমান পুনরায় কিছু খেজুর নিয়ে আসলেন এবং বললেন: "আমি দেখেছি আপনি সদকা খান না; তাই এটি আপনার জন্য আমার ব্যক্তিগত উপহার (হাদিয়া)।"
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে "বিসমিল্লাহ" বলে খেলেন এবং সাহাবাদেরও খেতে বললেন।
সালমান মনে মনে উল্লসিত হয়ে বললেন: "এটি দ্বিতীয় নিদর্শন!"
তৃতীয় দিন জান্নাতুল বাক্বীতে রাসুল ﷺ এক সাহাবীর জানাজা শেষে বসে ছিলেন। সালমান অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে রাসুল ﷺ এর পেছনের দিকে ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছিলেন।
অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন নবী মুহাম্মদ ﷺ বুঝতে পারলেন এই নিঃস্ব বিদেশী মানুষটি কী খুঁজছেন!
তিনি নিজের কাঁধ থেকে চাদরটি সামান্য আলগা করে দিলেন।
সালমানের চোখ পড়ল দুই কাঁধের মাঝামাঝি কবুতরের ডিমের মতো উজ্জ্বল সেই বরকতময় "মোহরে নবুওয়ত"-এর ওপর!
সালমান আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পবিত্র কাঁধ ও পায়ে চুমু খেতে লাগলেন এবং তাঁর বুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
রাসুল ﷺ বললেন: "কে তুমি? তোমার কী পরিচয়?"
সালমান ফারসী তাঁর পারস্যের অগ্নিকুণ্ড থেকে শুরু করে দীর্ঘ বিশ বছরের এই রোমাঞ্চকর সত্য সন্ধানের কাহিনী শোনালেন। সমস্ত সাহাবী কান্নায় ভিজে গেলেন।
পরবর্তীতে রাসুল ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম চাঁদা তুলে এবং সালমানের জমিতে তিনশত খেজুর গাছ রোপণ করে তাঁকে সেই ইহুদির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আনলেন। খন্দকের যুদ্ধে সালমান ফারসী (রা.) এর প্রজ্ঞাময় পরিখা খননের বুদ্ধিতেই সমগ্র মুসলিম উম্মাহ কুরাইশদের মহা আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
======================================================================
বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ (KEY PRACTICAL LESSONS)
======================================================================
(1) [সত্যের সন্ধান] সত্যের জন্য পরিবার ও পার্থিব প্রাচুর্য ত্যাগের সাহস
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: বিপুল ভূসম্পত্তি ও রাজকীয় আরাম ছেড়ে সালমান বছরের পর বছর কষ্ট করেছেন একমাত্র নির্ভেজাল তাওহীদের সন্ধানে।
(2) [ইসলামের বিশ্বজনীনতা] জাতীয়তা বা বর্ণের কোনো ভেদাভেদ ইসলামে নেই
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: পারস্যের এক সাবেক দাসকে রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজের পরিবারের সদস্য "আহলে বাইত"-এর মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করেছেন।
