ইসলামিক ঘটনা
শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।
মা হাজেরা (আ.) এর সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ব্যাকুল সায়ী ও বরকতময় জমজম কূপের আবির্ভাব
আল্লাহর ওপর নিখুঁত তাওয়াক্কুল ও মাতৃস্নেহের এক অনন্য অমর মহাকাব্য মা হাজেরা (আ.) এর এই সত্য ঘটনা। কীভাবে একজন একাকী নারী এক ফোটা পানির জন্য পাথুরে পাহাড়ে ছুটেছিলেন এবং তাঁর সেই ত্যাগকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিয়ামত পর্যন্ত কোটি কোটি হাজির জন্য বাধ্যতামূলক ইবাদত বানিয়ে দিয়েছেন—এটি তারই জীবন্ত ইতিহাস।
বর্তমান পবিত্র মক্কা নগরী তখন ছিল সম্পূর্ণ জনমানবহীন এক পাথুরে উপত্যকা। না ছিল কোনো গাছপালা, না কোনো পশুর বিচরণ, না পানির কোনো উৎস। এই মরুভূমিতে নবজাতককে নিয়ে একা অবস্থান করা ছিল বাহ্যিক দৃষ্টিতে নিশ্চিত মৃত্যুর সমান।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) মহান রবের সরাসরি আদেশে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মা হাজেরা এবং তাঁদের দুগ্ধপোষ্য একমাত্র শিশু ইসমাইল (আ.) কে সাথে নিয়ে এক সুদূর মরুভূমির দিকে রওয়ানা হলেন। পথ চলতে চলতে তিনি মক্কার এক জনশূন্য উপত্যকায় পৌঁছালেন, যেখানে বর্তমানে কাবার পবিত্র ঘর অবস্থিত।
সেখানে একটি বড় বাবলা গাছের নিচে ইব্রাহিম (আ.) মা হাজেরা ও শিশু ইসমাইলকে নামিয়ে দিলেন। তাঁদের কাছে রেখে দিলেন মাত্র একটি চামড়ার থলেতে কিছু খেজুর এবং একটি চামড়ার মশকে সামান্য কিছু খাবার পানি। এরপর তিনি পেছনে ফিরে একাকী ফিলিস্তিনের দিকে রওনা হলেন।
মা হাজেরা বিস্মিত ও ব্যাকুল হয়ে স্বামীর পিছু পিছু কিছুটা দূর ছুটে গেলেন। তিনি ডেকে বললেন:
"ইয়া ইবরাহীম! আইনা তাযহাবু ওয়া তাতরুকুনা বিহাযাল ওয়াদী আল্লাযী লাইসা ফীহি আনীসুন ওয়ালা শাই?"
(হে ইব্রাহিম! আপনি আমাদের এই নির্জন প্রান্তরে কোথায় ফেলে চলে যাচ্ছেন, যেখানে কোনো মানুষ নেই এবং কোনো প্রাণের চিহ্নও নেই?)
ইব্রাহিম (আ.) কোনো জবাব দিলেন না, পেছনেও তাকালেন না। তাঁর দুই চোখ দিয়ে তখন নিঃশব্দে অশ্রু ঝরছিল। মা হাজেরা বারবার একই প্রশ্ন করলেন, কিন্তু ইব্রাহিম (আ.) নিরুত্তর রইলেন।
তখন প্রজ্ঞাবতী মা হাজেরা বুঝতে পারলেন এটি কোনো সাধারণ সিদ্ধান্ত নয়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন:
"আ-আল্লাহু আমরাকা বিহাযা?"
(আল্লাহ কি আপনাকে এই নির্দেশ দিয়েছেন?)
ইব্রাহিম (আ.) ধীর কণ্ঠে উত্তর দিলেন: "নাআম" (হ্যাঁ!)।
মুহূর্তের মধ্যে মা হাজেরার অন্তরের সমস্ত ভয় ও দ্বিধা কেটে গেল। তাওয়াক্কুলের চূড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি শান্ত কিন্তু বজ্রকণ্ঠে বললেন:
"ইযান লা ইউদায়্যিউনা!"
(তাহলে যান! যিনি নির্দেশ দিয়েছেন, সেই আল্লাহ কখনোই আমাদের ধ্বংস করবেন না!)
ইব্রাহিম (আ.) কিছুটা দূরে "ছানিয়া" নামক স্থানে পৌঁছালেন, যেখান থেকে মা হাজেরা আর তাঁকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। তখন তিনি কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে দুই হাত তুলে রবের দরবারে সেই ঐতিহাসিক অশ্রুসজল মোনাজাত করলেন:
"হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের এক নির্জন শস্যহীন উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের সান্নিধ্যে রেখে যাচ্ছি... যাতে তারা সালাত কায়েম করে। অতএব আপনি কিছু মানুষের অন্তর এদের প্রতি আকৃষ্ট করে দিন এবং ফলমূল দিয়ে এদের রিজিকের ব্যবস্থা করুন!"
কয়েক দিন পর মশকের পানি ফুরিয়ে গেল এবং চামড়ার থলের খেজুরও শেষ হলো। মা হাজেরার বুকের দুধ শুকিয়ে গেল। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় শিশু ইসমাইল ছটফট করতে লাগলেন এবং ব্যথায় মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগলেন।
সন্তানের এই করুণ আর্তনাদ মা হাজেরা সহ্য করতে পারলেন না। তিনি পানির সন্ধানে বা কোনো পথচারীর কাফেলার আশায় নিকটবর্তী "সাফা" পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেন। চারদিকে তাকালেন, কিন্তু ধূ ধূ প্রান্তর ছাড়া কিছু চোখে পড়ল না।
এরপর তিনি নিচে নেমে নিজের কাপড়ের আঁচল সামলে উপত্যকার নিচু অংশে একজন ক্লান্ত পথিকের মতো দৌড়ে গিয়ে বিপরীত দিকের "মারওয়া" পাহাড়ে উঠলেন। সেখানেও কাউকে পেলেন না।
এভাবে তিনি সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে ব্যাকুল চিত্তে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন।
(রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন: এই কারণেই হজের সময় মানুষ এই দুই পাহাড়ের মাঝে সাতবার সায়ী করে থাকে)।
সপ্তমবারে যখন তিনি মারওয়া পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় ছিলেন, তখন তিনি হঠাৎ এক অস্পষ্ট মিষ্টি আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি নিজেকে বললেন: "চুপ করো!"
তিনি কান পেতে শুনলেন। পুনরায় সেই শব্দ হলো। তিনি বললেন: "তুমি যে-ই হও, যদি তোমার সাহায্য করার ক্ষমতা থাকে, তবে সাহায্য করো!"
ঠিক সেই মুহূর্তে শিশু ইসমাইলের পায়ের কাছে এক অলৌকিক দৃশ্য উদ্ভাসিত হলো। আল্লাহর আদেশে ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) সেখানে আবির্ভূত হলেন এবং নিজের ডানা বা পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন।
সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে বরফের মতো শীতল ও সুমিষ্ট পানির এক প্রবল ফোয়ারা তীব্র বেগে উপচে উঠতে লাগল!
মা হাজেরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে দ্রুত কূপে নেমে চারদিকে বালুর বাঁধ দিতে লাগলেন যাতে পানি বয়ে না যায়। তিনি দুই হাতে পানি নিজের মশকে ভরতে ভরতে মুখে বলতে লাগলেন: "যম যম! যম যম!" (থামো! থামো!)।
তিনি পানি পান করলেন, তাঁর বুক জুড়াল এবং শিশু ইসমাইলকে তৃপ্তিসহকারে দুধ পান করালেন।
জিবরাঈল (আ.) মা হাজেরাকে বললেন:
"ধ্বংস বা অভাবের ভয় করবেন না! এখানেই রয়েছে আল্লাহর ঘর, যা এই শিশু ও তার পিতা অচিরেই পুনর্নির্মাণ করবে। আর আল্লাহ কখনোই তাঁর বান্দাদের ধ্বংস করেন না।"
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"ইয়ারহামুল্লাহু উম্মা ইসমাঈল! লাও তারা কাত যামযাম... লাকানাত যামযामु আইরান মাঈনা!"
(আল্লাহ ইসমাইলের মায়ের ওপর রহম করুন! তিনি যদি জমজমকে এভাবে বাঁধ না দিয়ে ছেড়ে দিতেন, তবে জমজম আজ সারা পৃথিবীর জন্য এক বিশাল প্রবাহমান নদীতে পরিণত হতো!)
সেই পবিত্র জমজমের পানির কারণে পরবর্তীতে ইয়েমেনের বিখ্যাত "জুরহুম" গোত্র সেখানে এসে বসতি স্থাপন করে এবং নির্জন মরুভূমি এক বরকতময় আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়।
======================================================================
বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ (KEY PRACTICAL LESSONS)
======================================================================
(1) [তাওয়াক্কুল ও অবিচল বিশ্বাস] আল্লাহর নির্দেশের সামনে সমর্পণই মুক্তির চাবিকাঠি
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: বাহ্যিক সকল সম্বল হারিয়েও যিনি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন, আল্লাহ মরুভূমির শুষ্ক পাথর ফুঁড়েও তাঁর জন্য সুমিষ্ট রিজিক প্রবাহিত করে দেন।
(2) [মাতৃত্ব ও পরিশ্রম] ভরসার পাশাপাশি প্রচেষ্টা চালানো আবশ্যক
বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: মা হাজেরা অলৌকিক সাহায্যের অপেক্ষায় হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি, বরং সন্তানের জন্য সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাতবার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন।
