ইসলামিক ঘটনা

ইসলামিক ঘটনা

শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।

← সব ঘটনা

কাব ইবনে মালিক (রা.) এর পরম সত্যবাদিতা ও পঞ্চাশ দিনের বয়কটের পর আসমানী তাওবা

তাবুক যুদ্ধের পূর্বে কাব ইবনে মালিক (রা.) ছিলেন শারীরিক ও আর্থিকভাবে জীবনের সবচেয়ে সচ্ছল অবস্থায়। তাঁর কাছে ছিল দ্রুতগামী দুটি তাজা সওয়ারী উটনী। কিন্তু তীব্র গরম ও বাগানের সুস্বাদু খেজুরের মোহে পড়ে তিনি মনে মনে ভাবলেন: "আজ না যাই, কাল প্রস্তুতি নিয়ে দ্রুত সৈন্যবাহিনীর সাথে মিলিত হব।" এভাবে গাফিলতিতে দিন অতিবাহিত হতে হতে রাসুলুল্লাহ ﷺ বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে মদিনা ত্যাগ করলেন।

রাসুল ﷺ চলে যাওয়ার পর কাব (রা.) মদিনায় ঘুরে ঘুরে দেখলেন—কেবল চিহ্নিত মুনাফিক আর অক্ষম বৃদ্ধ-অসুস্থ ব্যক্তিরা ব্যতীত সব খাঁটি মুমিন যুদ্ধে চলে গেছেন। তখন তাঁর অন্তরে এক বিশাল অপরাধবোধ চেপে বসল।

রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন তাবুক থেকে বিজয়ীর বেশে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন প্রথা অনুযায়ী মসজিদে দুই রাকাত সালাত আদায় করে লোকদের সাথে বসলেন। আশি জনেরও বেশি মুনাফিক এসে নানা ধরণের মিথ্যা কসম ও বানোয়াট অজুহাত উপস্থাপন করল। রাসুল ﷺ তাঁদের মুখের কথা মেনে নিয়ে তাঁদের অন্তরের হিসাব আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলেন।

এরপর আসলেন কাব ইবনে মালিক (রা.)। তিনি বলেন:

"আমি ছিলাম বাকপটু ও যুক্তি উপস্থাপনকারী একজন কবি। আমি চাইলে যেকোনো অজুহাত তৈরি করে রাসুল ﷺ এর অসন্তোষ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারতাম। কিন্তু আমি মনে মনে বললাম: আল্লাহর কসম! আমি যদি আজ কোনো মিথ্যা কথা বলে রাসুল ﷺ কে সন্তুষ্ট করি, তবে আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে সত্য উন্মোচন করে তাঁকে আমার ওপর অসন্তুষ্ট করে দেবেন। আর যদি সত্য বলে ফেলি, তবে তিনি কষ্ট পাবেন ঠিকই, কিন্তু আমি আল্লাহর ক্ষমার আশা করতে পারব।"

কাব (রা.) রাসুল ﷺ এর সামনে গিয়ে সালাম দিলেন। রাসুল ﷺ কিছুটা অসন্তুষ্ট মুচকি হাসি দিয়ে বললেন: "কীসে তোমাকে যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত রাখল? তুমি কি সওয়ারী কেননি?"

কাব (রা.) বিনম্র কণ্ঠে বললেন:

"ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর কসম, কোনো ওজর বা অপারগতা আমার ছিল না। আমি এই অভিযানের চেয়ে কোনো দিন এতটা সবল ও সচ্ছল ছিলাম না। আমার কেবল অলসতা ও ভুল হয়েছিল।"

তখন আল্লাহর রাসুল ﷺ বললেন: "ইনি সত্য বলেছেন। ওঠো, যতক্ষণ না আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কোনো ফায়সালা করেন!"

কাব (রা.) এর মতো আরও দুইজন সত্যবাদী বদরী সাহাবী—মুরারাহ ইবনুর রাবী ও হিলাল ইবন উমাইয়া (রা.)—একইভাবে সত্য স্বীকার করলেন।

এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ জারি করলেন: "এই তিন ব্যক্তির সাথে মদিনার কোনো মানুষ কথা বলতে পারবে না!"

শুরু হলো কঠিন এক মানসিক পরীক্ষা।

মদিনার প্রিয় মানুষেরা মুখ ফিরিয়ে নিল। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে নিজের আপন আত্মীয় ও প্রাণের ভাইয়েরাও সালামের জবাব পর্যন্ত দিতেন না। কাব (রা.) নিজের বাল্যবন্ধু ও চাচাতো ভাই আবু কাতাদাহ (রা.) এর বাগানের প্রাচীর টপকে গিয়ে সালাম দিলেন। কিন্তু প্রিয় বন্ধুও চোখের পানি চেপে মুখ ফিরিয়ে বললেন: "আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।" কাব (রা.) কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

এরই মধ্যে একদিন শামের খ্রিস্টান গাসসান রাজার এক দূত এসে কাব (রা.) এর হাতে একটি রাজকীয় চিঠি তুলে দিল। চিঠিতে রাজা লিখেছিল:

"আমরা শুনেছি তোমার নেতা তোমাকে বর্জন করেছে ও অপমানিত করেছে। তুমি আমাদের দরবারে চলে আসো, আমরা তোমাকে সর্বোচ্চ রাজকীয় সম্মান ও ঐশ্বর্য দেব!"

কাব (রা.) চিঠিটি পড়ে বললেন: "ইন্না লিল্লাহ! এটি আরেকটি ভয়ঙ্কর পরীক্ষা!" তিনি তৎক্ষণাৎ কোনো চিন্তা না করে সেই প্রলোভনের রাজকীয় চিঠিটি জ্বলন্ত চুলার আগুনে নিক্ষেপ করে ছাই করে দিলেন!

চল্লিশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর রাসুল ﷺ এর পক্ষ থেকে দ্বিতীয় নির্দেশ এলো: "তোমরা নিজ নিজ স্ত্রীদের থেকেও পৃথক থাকো!" কাব (রা.) স্ত্রীকেও বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন।

এভাবে পঞ্চাশ দিন পূর্ণ হলো। সমগ্র পৃথিবী তাঁদের ওপর এত সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল যে শ্বাস নেওয়ার জায়গাটুকুও যেন অবশিষ্ট ছিল না।

পঞ্চাশতম দিনের ফজরের সালাত শেষে কাব (রা.) নিজের ঘরের ছাদে অশ্রুসিক্ত চোখে বসে আল্লাহর কাছে বুক ফাটা কান্নায় প্রার্থনা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে সালা পর্বতের চূড়া থেকে এক ব্যক্তির উচ্চকণ্ঠের চিৎকার মদিনার আকাশে প্রতিধ্বনিত হলো:

"ইয়া কাবাবনা মালিক! আবশির!"

(হে কাব ইবনে মালিক! সুসংবাদ গ্রহণ করো! আল্লাহ তোমার তাওবা কবুল করেছেন!)

মুহূর্তের মধ্যে চারদিক থেকে সাহাবায়ে কেরাম দৌড়ে আসতে লাগলেন। কাব (রা.) কৃতজ্ঞতার সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। তিনি আনন্দাশ্রু মুছতে মুছতে রাসুল ﷺ এর দরবারে উপস্থিত হলেন। সেখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পবিত্র চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের মতো আলো ছড়াচ্ছিল।

রাসুল ﷺ তাঁর হাত শক্ত করে ধরে বললেন:

"আবশির বিখাইরি ইয়াওমিন মাররা আলাইকা মুনযু ওয়ালাদাতকা উম্মুক!"

(তোমার মা যেদিন তোমাকে জন্ম দিয়েছিলেন, তারপর থেকে আজ তোমার জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সৌভাগ্যের দিন! আনন্দ প্রকাশ করো!)

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবায় এই তিন সত্যবাদী বান্দার ক্ষমা ঘোষণার চিরন্তন আয়াত অবতীর্ণ করলেন। সত্যবাদিতার পুরস্কার হিসেবে কাব (রা.) চিরকালের জন্য উম্মাহর অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত হলেন।

======================================================================

বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ (KEY PRACTICAL LESSONS)

======================================================================

(1) [সত্যের অমোঘ বিজয়] চরম ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও চিরকাল সত্যে অটল থাকা

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: মিথ্যা সাময়িক শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারে, কিন্তু আল্লাহর অসন্তোষ ডেকে আনে; আর সত্য সাময়িক কষ্টে ফেললেও চিরস্থায়ী সম্মান এনে দেয়।

(2) [দ্বীনের আনুগত্য ও প্রলোভন ত্যাগ] কঠিন মুহূর্তে শত্রুর রাজকীয় সাহায্য প্রত্যাখ্যান

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: মদিনায় সবাই যখন সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল, তখন খ্রিস্টান রাজার রাজকীয় প্রস্তাব তিনি চুলার আগুনে পুড়িয়ে ঈমানের অবিচলতা দেখিয়েছেন।

← সব ঘটনা

Scroll to Top