ইসলামিক ঘটনা

ইসলামিক ঘটনা

শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা — তালিকা থেকে চাপ দিয়ে পড়ুন।

← সব ঘটনা

কুষ্ঠরোগী, অন্ধ ও টেকো ব্যক্তির পরীক্ষা এবং অকৃতজ্ঞতার পরিণতি

রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবাদের সামনে বনী ইসরাঈলের এক মর্মস্পর্শী ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন: বনী ইসরাঈলের মধ্যে তিনজন ব্যক্তি ছিল—একজন শ্বেতী বা কুষ্ঠরোগী, যার চামড়ার বিকৃতি দেখে মানুষ ঘৃণা করত; একজন টেকো মাথার ব্যক্তি, যার মাথার কদর্যতার কারণে মানুষ তাকে সমাজে হেয় করত; এবং একজন সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন অন্ধ ব্যক্তি, যে মানুষের করুণার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁদের তিনজনকে পরীক্ষা করার ইচ্ছা করলেন। তাই তিনি একজন সম্মানিত ফেরেশতাকে মানব রূপ দান করে তাঁদের নিকট প্রেরণ করলেন।

ফেরেশতা প্রথমে কুষ্ঠরোগীর কাছে এসে কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন:

"কোন জিনিসটি তোমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয়?"

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল: "সুন্দর রঙ এবং দাগহীন উজ্জ্বল ত্বক; কারণ মানুষ আমার এই কদর্য চামড়ার কারণে আমাকে অত্যন্ত ঘৃণা করে এবং আমার কাছ থেকে দূরে সরে থাকে।"

ফেরেশতা পরম মমতায় তার শরীরে নিজের হাত স্পর্শ করলেন। সাথে সাথে অলৌকিকভাবে তার সমস্ত কুষ্ঠরোগ বিলীন হয়ে গেল এবং তার দেহ অপূর্ব রূপ ও লাবণ্যময় সুন্দর ত্বকে রূপান্তরিত হলো।

ফেরেশতা পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন: "জীবিকার মধ্যে কোন ধরণের সম্পদ তোমার সবচেয়ে প্রিয়?"

সে বলল: "উট।"

তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবর্তী উৎকৃষ্ট উটনী প্রদান করা হলো। ফেরেশতা দোয়া করলেন: "বারাকাল্লাহু লাকা ফীহা" (আল্লাহ এতে তোমার জন্য প্রভূত বরকত দান করুন)।

এরপর ফেরেশতা টেকো মাথার ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন:

"তোমার কাছে কোন জিনিসটি সবচেয়ে কাম্য?"

সে বলল: "সুন্দর চুল এবং যেন আমার মাথার এই টেকো দাগ দূর হয়ে যায়, যার জন্য মানুষ আমাকে সমাজে উপহাস করে।"

ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলালেন। মুহূর্তের মধ্যে তার টাক দূর হয়ে ঘন, উজ্জ্বল কালো চুল গজিয়ে উঠল।

ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন: "কোন সম্পদ তোমার প্রিয়?"

সে বলল: "গরু।"

তাকে একটি গর্ভবতী সুস্থ গাভী দেওয়া হলো এবং ফেরেশতা দোয়া করলেন: "আল্লাহ এতে তোমার জন্য বরকত দিন।"

অতঃপর ফেরেশতা তৃতীয় ব্যক্তি অর্থাৎ সেই অন্ধের নিকট গমন করলেন। তিনি বললেন:

"কোন জিনিসটি তোমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়?"

অন্ধ ব্যক্তি বিনম্র চিত্তে হাত তুলে বললেন: "আল্লাহ যেন আমার চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি তাঁর সুন্দর সৃষ্টি ও মানুষের মুখ দেখতে পারি।"

ফেরেশতা তার চোখের ওপর হাত রাখলেন। সাথে সাথে আল্লাহর কুদরতে তার দৃষ্টিশক্তি প্রস্ফুটিত হলো এবং সে আলো দেখতে পেল।

ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন: "কোন সম্পদ তোমার কাছে প্রিয়?"

সে বলল: "বকরি বা ছাগল।"

তাকে একটি সন্তানসম্ভবা বকরি দেওয়া হলো।

কালের পরিক্রমায় সেই উটনী, গাভী ও বকরির বংশবৃদ্ধি হতে লাগল। তাদের পশুগুলো একের পর এক প্রসব করতে করতে কয়েক বছরের ব্যবধানে এক বিশাল পশুপালে পরিণত হলো। প্রথম ব্যক্তির উটে বিশাল উপত্যকা পূর্ণ হয়ে গেল, দ্বিতীয় জনের গরুতে মাঠ ভরে গেল এবং তৃতীয় জনের ছাগলে পাহাড়-প্রান্তর সয়লাব হয়ে উঠল। তারা তিনজনই দেশের শীর্ষ ধনীদের কাতারে শামিল হলো।

এরপর এলো সেই পরীক্ষার দিন।

আল্লাহর আদেশে সেই ফেরেশতা নিজের রূপ পরিবর্তন করে পূর্বের সেই কুষ্ঠরোগীর বিকৃত আকৃতি, জীর্ণশীর্ণ বস্ত্র ও নিঃস্ব মুসাফিরের বেশে প্রথম ব্যক্তির বিলাসবহুল দরবারে উপস্থিত হলেন।

তিনি অতি কাতর কণ্ঠে বললেন:

"আমি এক নিঃস্ব মুসাফির। সফরের মধ্যে আমার সমস্ত পাথেয় ও অর্থ শেষ হয়ে গেছে। আজকের এই দিনে আল্লাহ তাআলার রহমত এবং তারপর আপনার বদান্যতা ছাড়া আমার বাড়ি ফেরার আর কোনো উপায় অবশিষ্ট নেই। যে মহান সত্তা আপনাকে এত অপূর্ব রূপ, নিষ্কলঙ্ক ত্বক এবং এই সুবিশাল উটের পাল দান করেছেন—সেই পরম সত্তার দোহাই দিয়ে আমি আপনার কাছে একটি মাত্র উট সাহায্য চাচ্ছি, যাতে আমি নিজ পরিজনের কাছে ফিরে যেতে পারি।"

কিন্তু অহংকারে অন্ধ ধনী ব্যক্তি মুখ বিকৃত করে রূঢ় ভাষায় উত্তর দিল:

"দূরে গিয়ে মরো! আমার অনেক দায়-দায়িত্ব ও দেনা রয়েছে, তোমাকে দেওয়ার মতো উদ্বৃত্ত সম্পদ আমার নেই!"

ফেরেশতা তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন: "আমার মনে হচ্ছে আমি আপনাকে চিনি! আপনি কি সেই কুষ্ঠরোগী ব্যক্তি নন, যাকে মানুষ ঘৃণা করত? আপনি কি সমাজে চরম নিঃস্ব ছিলেন না, অতঃপর আল্লাহ আপনাকে ধনী করেছেন?"

সে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে দাম্ভিকতার সাথে বলল: "কখনোই না! এই বিশাল সাম্রাজ্য ও অগাধ ধন-সম্পদ তো আমি আমার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি!"

তখন ফেরেশতা বললেন: "তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো, তবে আল্লাহ যেন তোমাকে আবার তোমার পূর্বের সেই কুষ্ঠরোগী ও নিঃস্ব অবস্থায় ফিরিয়ে দেন!"

এরপর ফেরেশতা সেই টেকো মাথার ব্যক্তির কাছে গিয়ে একই রূপ, ভাষা ও বিনয়ে সাহায্য চাইলেন। কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তিও প্রথম ব্যক্তির মতোই উদ্ধত ভাষায় অতীত অস্বীকার করল এবং মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সাহায্য করতে সাফ অস্বীকার করল।

ফেরেশতা তাকেও বললেন: "তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও, তবে আল্লাহ যেন তোমাকে আবার তোমার পূর্বের টাকপড়া নিঃস্ব অবস্থায় ফিরিয়ে দেন!"

অবশেষে ফেরেশতা সেই দৃষ্টিহীন ব্যক্তির কাছে উপস্থিত হলেন। তিনি অন্ধ, ক্লান্ত ও পথহারা ভিক্ষুকের বেশে লাঠিতে ভর দিয়ে এসে বললেন:

"আমি এক অন্ধ ও অসহায় পথিক। সফরের সমস্ত সম্বল ফুরিয়ে গেছে। আজকের দিনে আল্লাহ এবং আপনার সহানুভূতি ছাড়া আমার আর কোনো গতি নেই। যিনি আপনার চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছেন, সেই মহান আল্লাহর নামে আমি আপনার কাছে একটি মাত্র ছাগল সাহায্য চাচ্ছি, যেন আমি ঘরে ফিরতে পারি।"

অন্ধ ব্যক্তি তখন অশ্রুসজল নয়নে পরম আবেগে বলে উঠলেন:

"আল্লাহর কসম! আপনি সত্য বলেছেন। আমি জন্মান্ধ ছিলাম, আল্লাহ আমাকে চোখের আলো দিয়েছেন। আমি পথের ভিখারী ছিলাম, আল্লাহ আমাকে ধনবান বানিয়েছেন। আল্লাহর শপথ! আপনার যতগুলো ইচ্ছা ছাগল পছন্দ করে নিয়ে যান এবং যতগুলো ইচ্ছা রেখে যান। আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, আজ আল্লাহর নামে আপনি যা গ্রহণ করবেন, তার জন্য আমি আপনাকে বিন্দুমাত্র বাধা দেব না বা কষ্ট অনুভব করব না!"

তখন ফেরেশতা তাঁর আসল পরিচয় প্রকাশ করে পরম স্নেহে বললেন:

"আপনি আপনার সমস্ত সম্পদ নিজের কাছেই রাখুন। মূলত আপনাদের তিনজনকে আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিন পরীক্ষা করা হচ্ছিল। আপনার শোকরগোযারীর কারণে মহান আল্লাহ আপনার ওপর পরম সন্তুষ্ট হয়েছেন; আর আপনার অপর দুই সঙ্গীর অকৃতজ্ঞতা ও অহংকারের কারণে তিনি তাদের ওপর ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়েছেন।"

অতঃপর প্রথম দুই ব্যক্তি নিমেষেই তাদের রূপ ও সকল ধন-সম্পদ হারিয়ে পূর্বের মতো নিঃস্ব, লাঞ্ছিত ও বিকলাঙ্গ হয়ে গেল; আর তৃতীয় ব্যক্তি কৃতজ্ঞতার পুরস্কার হিসেবে সম্মান, সম্পদ ও আল্লাহর অফুরন্ত রহমত লাভ করলেন।

======================================================================

বাস্তব জীবনের শিক্ষণীয় দিকসমূহ (KEY PRACTICAL LESSONS)

======================================================================

(1) [শোকর ও নেয়ামতের মূল্য] অতীতের অসহায়ত্ব স্মরণে রাখা

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: উন্নতি ও প্রাচুর্য লাভের পর পেছনের দরিদ্র দিনগুলোর কথা মনে রেখে শুকরিয়া আদায় করাই মুমিনের গুণ।

(2) [অহংকার ধ্বংসের মূল] মিথ্যা আভিজাত্য প্রকাশের কুফল

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: নিজেকে বংশীয় ধনী দাবি করে দানশীলতা এড়িয়ে যাওয়া আল্লাহর গযব ডেকে আনে।

(3) [গরীবের হক আদায়] আল্লাহর নামে চাইলে ফিরিয়ে না দেওয়া

বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ: আল্লাহর নামের সম্মান রক্ষা করে নিঃস্বকে সাহায্য করলে সম্পদ পবিত্র ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

======================================================================

তথ্যসূত্র ও নিরীক্ষা তথ্য (VERIFIED SOURCES & AUDIT)

======================================================================

সনদ ও প্রামাণ্যতা স্তর: Sahih-Hadith-Sourced (১০০% যাচাইকৃত)

যাচাইকৃত তথ্যসূত্র তালিকা:

[1] সহিহ আল-বুখারী

লেখক/সংকলক: ইমাম বুখারী (রহ.)

খণ্ড: খণ্ড ৪

পৃষ্ঠা/হাদিস নম্বর: হাদিস ৩৪৬৪

প্রকাশনী: মাকতাবাতুল বাশরা

সমর্থিত দাবি ও বিবরণ: তিন ব্যক্তির রোগমুক্তি ও পরীক্ষার মূল হাদিস

যাচাই স্ট্যাটাস: যাচাই সম্পন্ন (Verified)

[2] সহিহ মুসলিম

লেখক/সংকলক: ইমাম মুসলিম (রহ.)

খণ্ড: খণ্ড ৪

পৃষ্ঠা/হাদিস নম্বর: হাদিস ২৯৬৪

প্রকাশনী: দারু ইহয়া ইত-তুরাস আল-আরাবী

সমর্থিত দাবি ও বিবরণ: অন্ধ ব্যক্তির স্বীকারোক্তি ও ফেরেশতার সন্তুষ্টির ঘোষণা

যাচাই স্ট্যাটাস: যাচাই সম্পন্ন (Verified)

গবেষক দলের নিরীক্ষা নোট:

হাদিসটি মুত্তাফাক্ব আলাইহ (সহিহ বুখারী ৩৪৬৪ ও সহিহ মুসলিম ২৯৬৪)। সনদ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এতে বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা সর্বসম্মত।

ব্যবহৃত কিতাবের সংস্করণ ও পাণ্ডুলিপি:

সহিহ বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, পরিচ্ছেদ: বনী ইসরাঈলের ঘটনা; সহিহ মুসলিম, কিতাবুজ জুহদ।

সম্পাদনা: নূরের পথ গবেষণা সেল

পর্যালোচক আলেম: মাওলানা মাহমুদ হাসান কাসেমী

======================================================================

======================================================================

← সব ঘটনা

Scroll to Top